Mamata Banerjee Attack Claims: কালীঘাটে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির সামনে বিশৃঙ্খলা, ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ও পুলিশের বক্তব্য নিয়ে তীব্র তরজা
কিংশুক সিংহ রায়, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক ঘটনার জেরে তীব্র রাজনৈতিক শোরগোল শুরু হয়েছে। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাসভবনের সামনে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক মহিলার উপস্থিতি ঘিরে চরম নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে দাবি করা হয়েছে যে তন্নিষ্ঠা সাহা বা অনুসূয়া সাহা নামের এক মহিলা মদ্যপ বা মাদকাসক্ত অবস্থায় ছুরি হাতে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে এগিয়ে আসেন এবং তাঁকে সরাসরি আক্রমণের চেষ্টা করেন। এই ঘটনার পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে সুর চড়িয়েছে শাসক দল, অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে অভিযুক্ত মহিলাকে আটক করে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জেড-প্লাস (Z+) নিরাপত্তা প্রাপ্ত একজন বিশিষ্ট নেত্রীর বাসভবনের কাছাকাছি কীভাবে এই ধরনের ঘটনা ঘটে গেল, তা নিয়ে বহুমুখী প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ নেত্রী তথা সাংসদ দোলা সেনের পক্ষ থেকে কালীঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে যে অভিযুক্ত মহিলা নিজেকে মুখ্যমন্ত্রীর ভাইঝি হিসেবে পরিচয় দিয়ে নিরাপত্তার বেড়াজাল ভেদ করে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বাসভবনের গেটের কাছাকাছি পৌঁছে যান। সেই সময় তাঁর হাতে একটি ধারালো অস্ত্র বা ছুরি ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তিনি অত্যন্ত অশালীন ও অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন এবং রাস্তায় শুয়ে পড়ে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। তৃণমূল নেতৃত্বের তরফে এহেন ঘটনাকে এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তুলে ধরে বলা হয়েছে যে এত কড়া নিরাপত্তার মাঝেও কীভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি হলো তা পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে দেখা জরুরি।

এই ঘটনার আকস্মিকতায় রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তৃণমূলের জাতীয় মুখপাত্র ও সাংসদ সাকেত গোখলে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন এবং জেড-প্লাস সুরক্ষাবলয়ের অধীনে থাকা সত্ত্বেও নেত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে যে ওই সময় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় এক মহিলার সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ও বচসা হয়েছিল এবং সেটিকে একটি ‘বচসা’ বা ‘উত্তপ্ত পরিস্থিতি’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। পুলিশ সূত্রের খবর অনুযায়ী, অভিযুক্ত অনসূয়া সাহা নামের ওই মহিলাকে ঘটনাস্থল থেকেই আটক করা হয়েছে এবং তাঁর কাছে কোনো ধারালো অস্ত্র বা হামলার চেষ্টার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রাথমিক তদন্তে উল্লেখ করা হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর হামলার ঘটনা বাংলায় নতুন নয়। গত অগস্ট মাসেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়িতে বড় আকারের পাথর ছোড়ার অভিযোগ উঠেছিল, যার জেরে তাঁর বুকে মারাত্মক ব্যথা হয়েছিল। এছাড়া মে মাসে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ডায়মন্ড হারবার ও সংলগ্ন এলাকায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনভয়ে হামলা, পাথর ও ডিম ছুড়ে মারার মতো ঘটনা ঘটেছিল। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে দলের বিভিন্ন বিধায়ক ও নেতাদের গাড়িতেও হামলার ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। এই ধারাবাহিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে কালীঘাটের বাসভবনের সামনে এই সাম্প্রতিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনাকে শাসক দল অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং এর পেছনে সুদূরপ্রসারী কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে গভীরভাবে আশঙ্কা প্রকাশ করছে।

সব মিলিয়ে, মঙ্গলবার সন্ধ্যার এই নাটকীয় পরিস্থিতি কালীঘাট এলাকার আইনশৃঙ্খলা এবং ভিভিআইপি (VVIP) সুরক্ষার নিরাপত্তাগত ত্রুটিগুলোকে আবার নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে যে ধৃত মহিলাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁর এই আচরণের পেছনের আসল উদ্দেশ্য কী ছিল তা বের করার চেষ্টা চলছে এবং আইন অনুযায়ী সমস্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলির তরফ থেকে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও রাজনৈতিক তরজা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। সাধারণ মানুষ ও দলের সমর্থকরা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা সম্পূর্ণভাবে সুনিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। আগামী দিনে পুলিশি তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পরেই এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার নেপথ্যের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।




