Suvendu Adhikari Junior Doctors: চোরবাগান কাণ্ডে ডিউটি ছেড়ে নেতার মতো স্টেটমেন্ট! কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট তলব মুখ্যমন্ত্রীর
রিপোর্ট: কিংশুক সিংহ রায়
Kolkata: কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন পুজোমণ্ডপে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক পদপিষ্টের ঘটনার পর আহতদের চিকিৎসাকেন্দ্র ও হাসপাতাল বদল নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে যখন উত্তেজনার পারদ চড়ে রয়েছে, ঠিক তখনই কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের জুনিয়র চিকিৎসকদের ভূমিকা নিয়ে এক বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সল্টলেকের স্বাস্থ্য ভবনে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও সাংবাদিক সম্মেলন থেকে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি অভিযোগ করেন যে ঘটনার দিন কিছু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিজেদের জরুরি ডিউটি বা কর্তব্য ছেড়ে রাজনৈতিক নেতার মতো সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে বিবৃতি বা স্টেটমেন্ট দিয়েছেন। জরুরি চিকিৎসা পরিষেবার মতো একটি সংবেদনশীল জায়গায় দাঁড়িয়ে এই ধরনের আচরণ কোনোভাবেই বরদাস্ত করা যায় না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়ে তিনি ওইদিন ডিউটিতে থাকা চিকিৎসকদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রিপোর্ট তলব করেছেন।
গত শনিবার রাতে চোরবাগান বিপর্যয়ের আকস্মিক ধাক্কায় যখন একের পর এক আহত মানুষকে চিকিৎসার জন্য কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল, তখন সেখানে এক বিশৃঙ্খল ও জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে অভিযোগ ওঠে যে সরকারি হাসপাতাল থেকে আহতদের জোর করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করানোর জন্য একপ্রকার চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা নিয়ে জুনিয়র চিকিৎসকরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলেছিলেন। এক জুনিয়র চিকিৎসকের অভিযোগ ছিল যে উপরমহল বা স্বাস্থ্যভবন থেকে নাকি নির্দেশ এসেছিল যাতে রোগীদের আত্মীয়দের কাছে অ্যাপোলোর মতো বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার অপশন রাখা হয়। এই পালটা অভিযোগ এবং চিকিৎসকদের গণমাধ্যমে দেওয়া বিভিন্ন বিবৃতি রাজ্যজুড়ে এক বিরাট রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়, যা নিয়ে শাসক ও বিরোধীদের মধ্যে চাপানউতোর চরমে ওঠে।

সাংবাদিক বৈঠকে এই পুরো বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান যে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যসচিবকে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন ওইদিনের ছবি ও সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের চিহ্নিত করার জন্য। তিনি অত্যন্ত হুঙ্কারের সুরে বলেন যে চিকিৎসকরা যদি নিজেদের জরুরি ডিউটি বা কর্তব্য চলাকালীন হাসপাতাল ছেড়ে বাইরে এসে রাজনৈতিক নেতার মতো স্টেটমেন্ট দিয়ে থাকেন, তবে তা সরাসরি সার্ভিস রুল বা সরকারি চাকরির নিয়মের পরিপন্থী হিসেবে গণ্য হবে। তবে একে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে দাগিয়ে না দিয়ে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করা প্রতিটি চিকিৎসকের প্রাথমিক মানবিকতা ও পেশাগত দায়বদ্ধতা। সংকটজনক পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিতর্ক এড়িয়ে চিকিৎসকরা যাতে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় সম্পূর্ণ মনঃসংযোগ করেন, তার ওপরই প্রশাসন সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে।
এদিকে সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো ও শয্যা সংকট নিয়ে বিরোধীদের সমস্ত সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন যে এসএসকেএম ট্রমা কেয়ার সেন্টার সহ অন্যান্য বড় হাসপাতালে অতিরিক্ত চাপ থাকলেও সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চোরবাগান কাণ্ডের তীব্র বেদনা ও ক্ষোভের মাঝে এই চিকিৎসক বনাম প্রশাসনের দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। চিকিৎসকদের একাংশের দাবি যেখানে রোগীর স্বজনদের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়ার নামে বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা নিয়ে ছিল, সেখানে প্রশাসনের তরফ থেকে ডিউটি ছাড়ার অভিযোগ তুলে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলো। আগামী দিনে এই রিপোর্ট জমা পড়ার পর স্বাস্থ্য দপ্তরের অন্দরে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রশাসনিক বা শৃঙ্খলাভঙ্গের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, এখন সেটাই দেখার প্রধান বিষয়।

সব মিলিয়ে, চোরবাগান মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং রোগী স্থানান্তর নিয়ে চলা এই রাজনৈতিক টানাপোড়েন বাংলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ফের এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে চিকিৎসকদের আন্দোলন ও প্রতিবাদের সুর এবং অন্যদিকে প্রশাসনের অনমনীয় মনোভাব—এই দুইয়ের সংঘাতে জনমানসে বিভ্রান্তি আরও বাড়ছে। সাধারণ মানুষ যখন এই বিপর্যয়ের প্রকৃত বিচার ও স্বচ্ছ চিকিৎসার নিশ্চয়তা চাইছে, তখন এই ধরনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব উৎসবের আনন্দকে সম্পূর্ণ ম্লান করে দিয়েছে। আগামী দিনে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর এই পারস্পরিক দ্বন্দ্ব মিটিয়ে সরকার কীভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে, তার ওপরই নির্ভর করছে গোটা স্বাস্থ্য দপ্তরের বিশ্বাসযোগ্যতা।




