Shardwat Mukherjee patient shifting: চোরবাগান কাণ্ডে রোগী স্থানান্তর নিয়ে বিতর্ক, ‘এটা রেফার নয়, ইচ্ছাপূরণ’, সাফাই স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখার্জির
রিপোর্ট: কিংশুক সিংহ রায়
Kolkata: কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন পুজোমণ্ডপে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক পদপিষ্টের ঘটনার পর আহতদের সরকারি হাসপাতাল থেকে জোর করে বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে কি না, তা নিয়ে রাজ্য জুড়ে যে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার প্রেক্ষিতে অবশেষে মুখ খুললেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখার্জি। স্বাস্থ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক বিশেষ প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, আহত রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার পুরো প্রক্রিয়াটি কোনোভাবেই ‘রেফার’ বা জবরদস্তিমূলক ছিল না, বরং এটি সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট রোগী ও তাঁদের পরিবারের নিজস্ব ইচ্ছা ও পছন্দের ওপর ভিত্তি করেই সম্পন্ন করা হয়েছিল। এই স্পষ্টীকরণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরকারি চিকিৎসা পরিকাঠামো নিয়ে ওঠা নানা জল্পনা ও সমালোচনার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং চিকিৎসকদের ভূমিকা নিয়ে সাফাই গেয়েছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখার্জি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন যে, গত চোরবাগানের ঘটনার পর সমস্ত আহতদের সবার আগে কলকাতার নামী সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালেই নিয়ে আসা হয়েছিল এবং সেখানে চিকিৎসকদের কঠোর তত্ত্বাবধানে তাঁদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করার কাজ চালানো হয়। রাত ৭টা থেকে ১২টার মধ্যে চিকিৎসকরা নিরলস পরিশ্রম করে আহতদের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং যখন তাঁরা পুরোপুরি স্থিতিশীল হন, তখন পরিবারের লোকজন উন্নত চিকিৎসার জন্য বা ব্যক্তিগত ইচ্ছার খাতিরে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশ মেনেই পরিবারের এই পছন্দ এবং ইচ্ছাকে সম্পূর্ণভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তাই এটিকে সাধারণ অর্থে ‘রেফার’ বা জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া বলে ভুল ব্যাখ্যা করা একেবারেই উচিত নয়।

সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীদের এই ধরনের স্থানান্তর নিয়ে বিরোধীরা যখন ঝাঁঝালো আক্রমণ শানিয়ে সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে, তখন স্বাস্থ্যকর্তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে শব্দচয়নের ক্ষেত্রে সকলেরই যথেষ্ট সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, ‘রেফার’ এবং ‘স্থানান্তর’—এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণাকে এক করে দেখলে সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে এবং প্রকৃত সত্য ঢাকা পড়ে যায়। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের বেড বা শয্যা সংকট নিয়ে ওঠা অভিযোগের কড়া জবাব দিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যে, মেডিক্যাল কলেজ বা এসএসকেএম হাসপাতালে শয্যা খালি নেই বলে যে দাবি করা হচ্ছে, বাস্তবে পরিস্থিতি ঠিক কেমন তা সঠিক পরিসংখ্যান দিয়ে যাচাই করা উচিত। অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কথা না বলে পরিসংখ্যানের নিরিখে আলোচনা করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি জোরদার আহ্বান জানিয়েছেন।
সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসার গুণমান এবং মৃত্যুর হার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শারদ্বত মুখার্জি দাবি করেছেন যে উভয় ক্ষেত্রেই মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে প্রায় একই রকম হয়ে থাকে, যদিও তিনি এই দাবির সমর্থনে তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যানের উল্লেখ করেননি। এছাড়া বিভিন্ন চিকিৎসক সংগঠন বা মহলের পক্ষ থেকে চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা ক্ষোভ থাকে, তবে তা অনুমানের মাধ্যমে জনমানসে না ছড়িয়ে সরাসরি স্বাস্থ্য দপ্তরের কাছে জানানোর জন্য তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি সাধনে গঠনমূলক আলোচনার দরজা সবসময় খোলা রয়েছে বলে তিনি স্পষ্ট করে দেন এবং চিকিৎসকদের আবেগ সরিয়ে রেখে তথ্যের ওপর ভরসা রাখার কথা বলেন।

সব মিলিয়ে, চোরবাগান মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরবর্তীতে আহতদের চিকিৎসা ও হাসপাতাল বদল সংক্রান্ত এই বিতর্ক রাজ্য রাজনীতি ও স্বাস্থ্য মহলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে যখন বিরোধীরা সরকারি হাসপাতালের বেহাল দশা এবং রোগী স্থানান্তরের নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ খোঁজার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই সাফাই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা প্রমাণ করার এক মরিয়া প্রয়াস বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আগামী দিনে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে আরও বেশি উন্নত এবং ত্রুটিমুক্ত করতে এই ধরনের বিতর্কগুলি যে আরও বড় রূপ নিতে পারে, তা বলাই বাহুল্য। সাধারণ মানুষের আস্থা বজায় রাখতে চিকিৎসা ব্যবস্থার এই সংবেদনশীল দিকগুলো নিয়ে প্রশাসন কতটা সতর্ক হয়, এখন সেটাই দেখার প্রধান বিষয়।




