Chorbagan Stampede Parents: চোরবাগানে পদপিষ্টের ঘটনায় নিহত ছাত্রীর বাবা-মার কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্য ও এই ট্র্যাজেডির নেপথ্য চাঞ্চল্যকর তথ্য
রিপোর্ট: তানিয়া রায়
Kolkata: কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের মণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড় ও হুড়োহুড়ির জেরে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক পদপিষ্টের ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যুর পর যেমন গোটা রাজ্যজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে, তেমনই অন্যদিকে স্বজন হারানোর বেদনায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন নিহতদের পরিবারগুলো। দুর্গাপুজোর আনন্দমুখর সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে নিউটাউনের বাসিন্দা একাদশ শ্রেণির ছাত্রী তানিয়া বিশ্বাস ও বর্ণালী হালদার আর ঘরে ফিরতে পারেননি, যা তাঁদের পরিবারগুলিকে এক গভীর ও অপূরণীয় শূন্যতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন বাবা-মা, আর তাঁদের এই বুকফাটা আর্তনাদ ও কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশের পরিবেশ।
উৎসবের এই দিনগুলো কীভাবে একটি পরিবারের কাছে চিরকালের মতো অন্ধকারের উপত্যকায় পরিণত হতে পারে, চোরবাগানের এই হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি তারই এক নির্মম সাক্ষী হয়ে রইল। নিহত বর্ণালীর বাবা গণমাধ্যমের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান যে তিনি পেশায় একজন রিকশাচালক, এবং ঘটনার দিন ফোন পেয়ে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন। সপরিবারে বা বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করতে যাওয়া তাঁর মেয়ে আর কোনোদিন জীবিত ফিরবে না তা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না, এবং তাঁদের পরিবারের জীবন থেকে দুর্গাপুজো চিরকালের মতো মুছে গেল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ভাই তার দিদিকে ছাড়া কীভাবে থাকবে এবং মা কীভাবে এই শোক সহ্য করবেন, সেই কথা ভেবে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তাঁরা। এমনকি যতবারই আগামী দিনে দুর্গোৎসব আসবে, ততবারই তাঁদের চোখের সামনে এই ভয়াবহ স্মৃতি জেগে উঠবে বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন শোকস্তব্ধ বাবা-মা। অন্যদিকে, চোরবাগান মণ্ডপের ঠিক ভেতরে সেই অভিশপ্ত মুহূর্তে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে এখনও সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক ধোঁয়াশা ও রহস্য বজায় রয়েছে। মণ্ডপের ভেতরে পর্যাপ্ত আলো ছিল কি না, কোনো মাইক থেকে বিশৃঙ্খলা এড়াতে নির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা।
প্রশাসনের প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে যে এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় ইতিমধ্যেই পুজো কমিটির সম্পাদক এবং সহ-সভাপতি সহ মোট ৭ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। চোরবাগান সর্বজনীনের সম্পাদক রাজা, সহ-সভাপতি শান্তনু দুবে, ক্রাউড ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে থাকা দুই কর্মী, বাঁশের স্ট্রাকচার প্রস্তুতকারী এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত খুন ও খুনের চেষ্টার ধারায় মামলা রুজু করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দায়িত্বে অবহেলার এই অভিযোগে প্রশাসনের তরফ থেকেও কড়া আইনি পদক্ষেপের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, চোরবাগান সর্বজনীনের এই ১৯ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে একটি অত্যন্ত কলঙ্কিত ও দুঃখজনক অধ্যায় হয়ে রইল, যা পুজো উদ্যোক্তা ও প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। উৎসবের আনন্দ কীভাবে সামান্য অবহেলা, অব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত মুনাফার লোভে মানুষের রক্তের নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, এই ঘটনা তারই এক চরম শিক্ষা দিয়ে গেল। যাঁদের সন্তানরা এই দুর্ঘটনায় চিরতরে হারিয়ে গেছেন, তাঁদের চোখের জল আর আইনি লড়াইয়ের এই দীর্ঘ পথ হয়তো কোনোদিনই সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না।




