Akbar Ram Siya Coin: মুঘল মুদ্রায় রাম-সীতার মূর্তি! সম্রাট আকবরের তৈরি দুষ্প্রাপ্য মুদ্রার অজানা ঐতিহাসিক গল্প
KOLKATA: Akbar Ram Siya Coin বা মুঘল সম্রাট আকবরের প্রবর্তিত ‘রাম-সীতা’ রৌপ্য মুদ্রার ইতিহাস ভারতের বুকে এক অভূতপূর্ব সম্প্রীতি এবং রোমাঞ্চকর ঐতিহ্যের গল্প বলে। ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে যখনই ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের কথা ওঠে, তখন ইতিহাসের পাতা থেকে সবার আগে উঠে আসে সম্রাট আকবরের নাম। ১৫৫৬ সাল থেকে ১৬০৫ সাল পর্যন্ত তাঁর দীর্ঘ রাজত্বকালে তিনি শুধু সাম্রাজ্য বিস্তারই করেননি, বরং ভিন্ন ধর্মের মানুষদের এক ছাতার তলায় আনার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। সেই প্রচেষ্টারই এক অমর এবং দুষ্প্রাপ্য নিদর্শন হলো এই ‘রাম-সীতা’ মুদ্রা। এটি এমন এক অবাক করা ঐতিহাসিক প্রমাণ, যা দেখলে আজও বিশ্বের তাবড় ইতিহাসবিদরা বিস্মিত হয়ে যান। এক মুঘল সম্রাটের রাজকীয় টাঁকশাল থেকে এমন একটি মুদ্রা বেরোচ্ছে, যার একদিকে হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি এবং অন্যদিকে ফার্সি হরফে ইসলামিক ক্যালেন্ডারের সময়কাল লেখা—এই ঘটনা তৎকালীন ভারতের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে আক্ষরিক অর্থেই এক মেগা বিপ্লব ছিল। সকালবেলা ইতিহাসের এই অজানা অধ্যায়ের পাতা উল্টালে আজও গায়ে কাঁটা দেয়।

এই ঐতিহাসিক মুদ্রাটি তৈরি হওয়ার পেছনের গল্পটি একাধারে পৌরাণিক এবং রাজনৈতিক। সম্রাট আকবর তাঁর জীবনের শেষ ভাগে এসে হিন্দু ধর্ম, দর্শন এবং মহাকাব্যের প্রতি তীব্রভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তিনি ফতেহপুর সিক্রিতে ‘মক্তব খানা’ বা অনুবাদ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে মহাভারত ও রামায়ণের মতো পবিত্র হিন্দু মহাকাব্যগুলিকে ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল। আকবর যখন রামায়ণের কাহিনী শোনেন, তখন মর্যাদা পুরুষোত্তম ভগবান রামের আদর্শ, তাঁর সত্যনিষ্ঠা এবং মাতা সীতার ত্যাগের কাহিনী সম্রাটের মনে এক গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, ভারতের আপামর জনমানসে রাম ও সীতা শুধু দেবতা নন, তাঁরা এক চিরন্তন আবেগ। নিজের প্রবর্তিত ধর্মমত ‘দীন-ই-ইলাহী’ এবং ‘সুলহ-ই-কুল’ (সর্বজনীন শান্তি)-এর আদর্শকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক চূড়ান্ত বার্তা দিতেই তিনি এই বিশেষ মুদ্রাটি তৈরি করার মেগা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। এটি ছিল তাঁর রাজত্বের ৫০তম বছরের (১৬০৪-১৬০৫ সাল) এক অবিস্মরণীয় ঘটনা।
এই বিশেষ মুদ্রার নকশা এবং কারুকার্য তৎকালীন মুঘল টাঁকশালের এক অনন্য এবং বিরল বিস্ময়। মুদ্রাটির ডানদিকের অংশে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে খোদাই করা রয়েছে ভগবান রাম এবং দেবী সীতার দণ্ডায়মান মূর্তি। রামের পরনে রয়েছে রাজকীয় পোশাক, মাথায় মুকুট এবং হাতে ধরা রয়েছে তাঁর বিখ্যাত ধনুক ও তীর। তাঁর ঠিক পাশেই শান্ত এবং করুণাময়ী রূপে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দেবী সীতা, যাঁর হাতে একটি ফুল শোভা পাচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মূর্তির ঠিক ওপরেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেবনাগরী হরফে লেখা রয়েছে “রাম সীয়” (রাম-সীতা)। অন্যদিকে, মুদ্রার বাঁদিকের অংশে সম্পূর্ণ বিপরীত এক সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট। সেখানে চারপাশের সুন্দর ফুলেল নকশার মাঝে ফার্সি ভাষায় লেখা রয়েছে মুদ্রার প্রচলনের সাল ও মাস। ফার্সিতে খোদাই করা রয়েছে “ইলাহী ৫০” (আকবরের রাজত্বের ৫০তম বছর) এবং নিচে লেখা রয়েছে “আমর্দাদ” (ফার্সি ক্যালেন্ডারের একটি মাস)। একটি মাত্র রৌপ্য খণ্ডের দুই পিঠে দুই ভিন্ন ধর্মের এমন অপূর্ব সহাবস্থান ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি দেখা যায় না।

ঐতিহাসিকদের মতে, এই ‘রাম-সীতা’ মুদ্রাটি বাজারে দৈনন্দিন কেনাবেচা বা সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য খুব বেশি সংখ্যায় তৈরি করা হয়নি। বরং এটি ছিল একটি স্মারক মুদ্রা বা মেডেলিয়ন, যা মূলত অর্ধ-টাকা (Half Rupee) বা মোহর হিসেবে পরিচিত ছিল। আকবর তাঁর রাজদরবারের বিশেষ এবং সম্মানীয় ব্যক্তিদের, বিশেষ করে যাঁরা তাঁর ‘দীন-ই-ইলাহী’ আদর্শের প্রতি অনুগত ছিলেন, তাঁদেরকেই এই মুদ্রাটি উপহার হিসেবে প্রদান করতেন। ১৬০৪ সালের আগস্ট মাসে (আমর্দাদ মাস) এই মুদ্রাটি বাজারে আসে, যা ছিল আকবরের মৃত্যুর মাত্র এক বছর আগের ঘটনা। এই মুদ্রাটি এতটাই দুষ্প্রাপ্য যে, বর্তমানে সারা বিশ্বে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি এমন আসল মুদ্রা টিকে রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্যারিসের মিউজিয়ামে, ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এবং কিছু অত্যন্ত বিত্তশালী ব্যক্তিগত সংগ্রাহকদের ভল্টে সযত্নে সংরক্ষিত আছে। যখনই আন্তর্জাতিক নিলামে এই মুদ্রার কোনো অস্তিত্ব প্রকাশ্যে আসে, তখন তার মূল্য কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত ছুঁয়ে যায়, কারণ এটি নিছক একটি ধাতু নয়, এটি ভারতের আত্মার একটি ঐতিহাসিক দলিল।
আজকের এই আধুনিক এবং দ্রুত গতির যুগে দাঁড়িয়ে যখন আমরা এই ধরনের প্রাচীন নিদর্শনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন তা আমাদের অনেক কিছু ভাবতে বাধ্য করে। প্রতিদিনের শত শত নেতিবাচক খবরের ভিড়ে, সকালবেলা এমন একটি ঐতিহাসিক এবং পৌরাণিক গল্পের মুখোমুখি হওয়া আমাদের শেকড়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছরেরও বেশি সময় আগে, যখন যোগাযোগের কোনো আধুনিক মাধ্যম ছিল না, তখন একজন সম্রাট শুধু একটি মুদ্রার মাধ্যমে গোটা দেশকে সম্প্রীতির যে মেগা বার্তা দিয়ে গিয়েছিলেন, তা আজকের দিনেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আকবরের এই ‘রাম-সীতা’ মুদ্রা শুধু মুদ্রা সংগ্রাহকদের কাছেই মহামূল্যবান নয়, বরং যাঁরা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে ভালোবাসেন, তাঁদের কাছে এটি এক পরম আরাধনার বস্তু। ধর্ম নিয়ে যখনই কোনো বিতর্ক মাথাচাড়া দেয়, তখন ইতিহাসের পাতায় সযত্নে লুকিয়ে থাকা এই ছোট রৌপ্য মুদ্রাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ভারতের আসল সৌন্দর্য তার বিভাজনে নয়, বরং তার ঐক্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে।




