Meta AI Glasses: ভারতে বিক্রি বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চশমার! গোপন ভিডিও ফাঁসের আতঙ্কে চরম বিপদে সাধারণ মানুষ
KOLKATA: Meta AI Glasses বা মেটা এআই গ্লাস বর্তমানে প্রযুক্তি দুনিয়ায় এক যুগান্তকারী আবিষ্কার হিসেবে বিবেচিত হলেও, সাধারণ মানুষের জন্য এটি এক চরম আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত দিন চশমা কেবল দুর্বল দৃষ্টিশক্তির মানুষদের দেখতে বা রোদ থেকে বাঁচতে সাহায্য করত। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই চশমাই এখন হয়ে উঠেছে এক ভয়ংকর হাতিয়ার। মেটা এবং রে-ব্যান (Ray-Ban)-এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি হওয়া এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) চালিত চশমার মাধ্যমে গান শোনা, ভিডিও রেকর্ডিং করা থেকে শুরু করে অজানা মানুষকে সহজেই চিনে ফেলা সম্ভব। এই চশমায় একটি আল্ট্রা ওয়াইড ক্যামেরা রয়েছে যার সাহায্যে অত্যন্ত হাই রেজলিউশন ছবি এবং ভিডিও তোলা যায়। এর পাশাপাশি ফেস রেকগনিশনের বিশেষ ব্যবস্থাও রয়েছে, যা দিয়ে যেকোনো মানুষের ছবি তুলে তার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিমেষের মধ্যে সংগ্রহ করা সম্ভব। ওপেন-ইয়ার ব্লুটুথ স্পিকার এবং একাধিক মাইক্রোফোন যুক্ত এই চশমা দিয়ে শুধু ভয়েস কমান্ড বা ইশারায় ছবি তোলা ও ভিডিও করা যায়, যার জন্য হাত ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন হয় না। আর ঠিক এই জায়গাতেই তৈরি হচ্ছে বিপত্তি, কারণ এই প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে রাস্তাঘাটে মানুষের অজান্তেই তাদের ব্যক্তিগত ভিডিও রেকর্ড করে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি এই চশমার অপব্যবহারের একাধিক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে, যা দেশের সাইবার নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। খাস কলকাতায় বিদিশা নামক এক ৩৫ বছর বয়সী কলেজ শিক্ষিকা এই চশমার মাধ্যমে চরম হেনস্তার শিকার হয়েছেন। গত ১১ জুন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে এক ব্যক্তি তাঁর পথ আটকে কথা বলার চেষ্টা করে এবং তাঁর অজান্তেই এই স্মার্ট গ্লাস ব্যবহার করে পুরো কথোপকথন গোপনে রেকর্ড করে নেয়। পরে সেই ভিডিওটি বিকৃত করে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যার জেরে ওই শিক্ষিকাকে ব্যাপক ট্রোলিং ও কু-মন্তব্যের শিকার হতে হয়। বিদিশার অভিযোগের ভিত্তিতে দীর্ঘ চেষ্টার পর পুলিশ ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) দায়ের করে এবং তাকে গ্রেপ্তার করে, যা ভারতে এই ধরনের সাইবার অপরাধের প্রথম পুলিশি মামলা বলে মনে করা হচ্ছে। শুধু কলকাতাই নয়, দিল্লির যন্তর মন্তরেও এক রূপান্তরকামী ব্যক্তির অজান্তে এই চশমার মাধ্যমে ভিডিও তুলে তা ভাইরাল করার অভিযোগ উঠেছে। এপ্রিলে ‘ট্রান্সজেন্ডার পার্সনস অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’-এর বিরুদ্ধে আয়োজিত এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে ‘স্কাই’ নামক ওই ব্যক্তি এই সাইবার ক্রাইমের শিকার হন। এছাড়া, যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে খোদ পুলিশের বিরুদ্ধেও এই মেটা এআই গ্লাস ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের চিহ্নিত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল, যা প্রমাণ করে যে এই নতুন প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর কতটা বড় আঘাত হানছে।

ভারতে এই মেটা এআই চশমার বিপুল চাহিদা এবং বাজারদর সাইবার বিশেষজ্ঞদের চিন্তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অনলাইন এবং অফলাইন বাজার সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমানে এই চশমার জেনারেশন ১ এবং জেনারেশন ২—দুটি ভার্সানই ভারতে পাওয়া যাচ্ছে। জেনারেশন ২-এর এই অত্যাধুনিক চশমার দাম শুরু হচ্ছে ৩৯,৯০০ টাকা থেকে এবং ফ্রেম সমেত তা ৪৫,৭০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে জেনারেশন ১-এর দাম কিছুটা কম, যা ছাড় সমেত ২২,০০০ থেকে ২৭,০০০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। মেটা ইন্ডিয়ার তরফ থেকে এখনও পর্যন্ত ভারতে বিক্রির কোনো সরকারি বা নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ করা না হলেও, কলকাতা, দিল্লি এবং মুম্বাইয়ের মতো মেট্রো শহরগুলির অফলাইন বাজার ও দোকানে এই চশমার ব্যাপক চাহিদা লক্ষ করা যাচ্ছে। রিলায়েন্স এবং স্যামসাংয়ের মতো সংস্থাও এই ব্যবসায় পা রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এত চড়া দাম হওয়া সত্ত্বেও আধুনিক প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই চশমা কেনার হিড়িক পড়ে গিয়েছে। অনলাইনে হাজার হাজার মানুষের রিভিউ থেকেই স্পষ্ট যে, ভারতের বাজারে এই চশমা ইতিমধ্যেই কতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, আর সেই জনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়েই সাইবার অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এই চশমার ব্যবহার নিয়ে অত্যন্ত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এআই বিশেষজ্ঞ অরিজিৎ মুখার্জীর মতে, এই চশমাটি দেখতে একেবারেই সাধারণ চশমার মতো, যার ফলে কেউ এটি পরে থাকলে তার উদ্দেশ্য বোঝা কার্যত অসম্ভব। রেকর্ডিংয়ের সময় এতে যে ছোট একটি এলইডি (LED) আলো জ্বলে, তা দিনের আলোয় প্রায় বোঝাই যায় না। এমনকি অনলাইনে বিশেষ স্টিকার পাওয়া যায় যা ওই আলোর ওপর লাগিয়ে দিলে রেকর্ডিং চলছে কি না, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া যায় না। সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ কিঞ্জল কান্তি ঘোষ জানিয়েছেন যে, এই চশমা ব্যবহারের বিপদ অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ফেস রেকগনিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিআইপি (VIP) অনুষ্ঠানে গোপনীয়তা ভঙ্গ করা থেকে শুরু করে, এটি দিয়ে অন্যের পাসওয়ার্ড হ্যাক করা এবং ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া খুব সহজেই সম্ভব। এমনকি সিনেমা হলে বসে কোনো ব্লকবাস্টার সিনেমা পুরো রেকর্ড করে বাজারে ছেড়ে দেওয়ার মতো পাইরেসির ঘটনাও ঘটতে পারে। তাঁর মতে, অবিলম্বে দেশের সরকারের উচিত এই ধরনের স্মার্ট ডিভাইসের ব্যবহারের ওপর কড়া আইনি নিয়ন্ত্রণ এবং নজরদারি জারি করা।

গোপনে তোলা এই ধরনের ব্যক্তিগত ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সরিয়ে ফেলার ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষকে চরম হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে সম্মতি ছাড়া ভিডিও তোলার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর কোনো আলাদা বা নির্দিষ্ট বিভাগ নেই, ফলে ভুক্তভোগীদের বাধ্য হয়ে ‘বুলিং অ্যান্ড হ্যারাসমেন্ট’-এর অধীনে অভিযোগ জানাতে হয়। ভারতের সাইবার আইনে এখনও পর্যন্ত এই ধরনের স্মার্ট পরিধানযোগ্য ডিভাইসের (Wearable Devices) মাধ্যমে হওয়া অপরাধের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ধারা নেই, যার ফায়দা তুলছে প্রতারকরা। কলকাতার বিদিশার ক্ষেত্রে তাঁর ভিডিওটি দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে অনলাইনে ছিল এবং সেটি ২৫ লাখেরও বেশি বার দেখা হয়েছিল। হাজার অভিযোগ সত্ত্বেও মেটা সেই ভিডিওটি সরায়নি, শেষ পর্যন্ত পুলিশের হস্তক্ষেপে অভিযুক্ত নিজে সেটি ডিলিট করতে বাধ্য হয়। যদিও মেটার তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তাদের চশমায় থাকা রেকর্ডিং এলইডি আলোটি বন্ধ করার কোনো উপায় নেই এবং কেউ সেটি ঢেকে রাখলে ক্যামেরা কাজ করবে না। ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরিও আশ্বাস দিয়েছেন যে, তাঁরা নিয়ম লঙ্ঘনকারী ভিডিওগুলি প্ল্যাটফর্ম থেকে মুছে ফেলেন। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ আলাদা। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির আড়ালে প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে মানুষের গোপনীয়তা, যা রুখতে ভারতের সাইবার আইনে অবিলম্বে কড়া আইনি সংশোধনী আনা প্রয়োজন বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।




