Parakiya Law in India: সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়, ব্যক্তি স্বাধীনতা বনাম ভেঙে পড়া দাম্পত্যের টানাপোড়েন
Kolkata: বর্তমান সময়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় অত্যন্ত চর্চিত এবং বিতর্কিত একটি বিষয় হলো ‘পরকীয়া’ বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক। মানুষের মনে প্রায়শই একটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক এবং বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন জাগে যে, ভারতে পরকীয়া বা এক্সট্রাম্যারিটাল অ্যাফেয়ার আসলে কি আইনি, বেআইনি নাকি আইনি সিদ্ধ? ২০১৮ সালে ভারতের মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট পরকীয়া সংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী রায় প্রদান করেছিল, যার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মনে এই আইনি বৈধতা নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করেন যে সুপ্রিম কোর্ট যেহেতু এটিকে আর অপরাধ বলে মানছে না, তার মানে হয়তো পরকীয়া এখন আইনি স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছে। কিন্তু আইনের আসল ব্যাখ্যা এবং সমাজের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিশ্লেষণ করলে সম্পূর্ণ অন্য একটি ছবি উঠে আসে। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা পরকীয়ার আইনি অবস্থান, এর সুবিধা-অসুবিধা এবং আমাদের সামাজিক কাঠামোয় এর ইনপুট বা প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
প্রথমেই পরকীয়ার আইনি অবস্থানটি একেবারে স্পষ্ট করে নেওয়া প্রয়োজন। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ ভারতীয় দণ্ডবিধির বা আইপিসি (IPC)-র ৪৯৭ নম্বর ধারাটিকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দেয়। এই ধারা অনুযায়ী আগে পরকীয়া একটি ফৌজদারি অপরাধ ছিল এবং দোষী সাব্যস্ত হলে ৫ বছর পর্যন্ত জেলের সাজা হতো। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট এই ধারা বাতিল করার অর্থ এই নয় যে পরকীয়াকে ‘আইনি সিদ্ধ’ বা উৎসাহিত করা হয়েছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে যে, পরকীয়া এখন আর কোনো ‘ফৌজদারি অপরাধ’ বা ক্রিমিনাল অফেন্স নয়, অর্থাৎ এর জন্য পুলিশ কাউকে জেলে ভরতে পারবে না। কিন্তু এটি এখনও একটি ‘দেওয়ানি অপরাধ’ বা সিভিল রং হিসেবেই বিবেচিত হবে। সোজা কথায় বলতে গেলে, স্বামী বা স্ত্রী যদি পরকীয়ায় লিপ্ত হন, তবে সেটি বিবাহবিচ্ছেদ বা ডিভোর্স পাওয়ার জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বৈধ আইনি কারণ বা গ্রাউন্ড হিসেবে গ্রাহ্য হবে।
![]()
এই রায়ের বা পরকীয়াকে অপরাধের তকমা থেকে মুক্ত করার বেশ কিছু ‘সুবিধা’ বা ইতিবাচক দিক রয়েছে, যা মূলত মানবাধিকার এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত। পুরনো ব্রিটিশ আমলের ৪৯৭ নম্বর ধারাটি চরম পিতৃতান্ত্রিক ছিল, যেখানে বিবাহিত মহিলাদের তাঁদের স্বামীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা ‘পণ্য’ হিসেবে গণ্য করা হতো। সেই আইনে শুধুমাত্র পুরুষদের শাস্তি হতো, মহিলাদের কোনো অধিকার বা নিজস্ব মতামত ছিল কাম্য ছিল না। সুপ্রিম কোর্ট এই ধারা বাতিল করে মহিলাদের ব্যক্তি স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং সমতার অধিকারকে (সংবিধানের ১৪, ১৫ এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ) সুনিশ্চিত করেছে। এছাড়া, অনেক সময় দেখা যেত যে রাগের বশবর্তী হয়ে বা প্রতিহিংসা মেটাতে স্বামীরা এই আইনের অপব্যবহার করে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করতেন। ফৌজদারি অপরাধের তকমা উঠে যাওয়ায় সেই পুলিশি হয়রানি এবং ব্ল্যাকমেইলিংয়ের পথ অনেকটাই বন্ধ হয়েছে, যা আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ।
তবে আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি যতই প্রগতিশীল হোক না কেন, আমাদের ভারতীয় সমাজ কাঠামোয় পরকীয়ার ‘অসুবিধা’ এবং নেতিবাচক প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর থেকে সমাজে এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে যে পরকীয়া হয়তো বৈধ হয়ে গিয়েছে, যার ফলে পারিবারিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটছে। ফ্যামিলি কোর্ট বা পারিবারিক আদালতগুলির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পরকীয়ার কারণে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা হু হু করে বাড়ছে। একটি সাজানো সংসার ভেঙে যাওয়ার ফলে সবচেয়ে বেশি মানসিক ট্রমা বা ক্ষতির শিকার হচ্ছে সেই পরিবারের নির্দোষ সন্তানরা। বাবা-মায়ের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক এবং তার জেরে হওয়া অশান্তি শিশুদের মনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক দাগ কেটে দেয়, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়। দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে পরম বিশ্বাস এবং আস্থার সম্পর্ক থাকে, পরকীয়া সেই বিশ্বাসের
ভিতকে চিরতরে ভেঙে চুরমার করে দেয়।
উপসংহারে বলা যায়, সমাজজীবনে পরকীয়ার ইনপুট হলো আইন এবং নৈতিকতার এক অদ্ভুত টানাপোড়েন। একটি আধুনিক এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কখনও তার নাগরিকদের বেডরুমে ঢুকে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তাই পরকীয়াকে জেলের সাজা থেকে মুক্ত করা আইনি দিক দিয়ে সঠিক ছিল। কিন্তু আইনি স্বাধীনতা মানেই নৈতিক অবক্ষয়ের লাইসেন্স নয়। সমাজকে সুস্থ এবং সুন্দর রাখতে গেলে প্রতিটি মানুষের নিজের দাম্পত্য জীবনের প্রতি সৎ থাকা এবং নিজস্ব নৈতিক দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত জরুরি। আইন দিয়ে হয়তো কাউকে জোর করে বিশ্বস্ত রাখা যায় না, কিন্তু পরকীয়ার মতো একটি ভুল পদক্ষেপ যে একাধিক মানুষের জীবন, একটি সুন্দর পরিবার এবং শিশুদের ভবিষ্যৎকে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে দিতে পারে—সেই সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রতিটি মানুষের থাকা উচিত। পরকীয়া বেআইনি না হলেও, এটি কখনোই নৈতিক বা সামাজিকভাবে সিদ্ধ হতে পারে না।




