Rejinagar By Election Result Controversy: অভিষেকের অভিযোগ উড়িয়ে ১০৯ নম্বর বুথের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ মুর্শিদাবাদের জেলাশাসকের
Murshidabad: মুর্শিদাবাদের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) প্রার্থী শাখারভ সরকার পঁচাত্তর হাজারের বেশি বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করে সমস্ত রাজনৈতিক হিসেবনিকেশ সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার ঠিক পরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি নির্দিষ্ট বুথের পরিসংখ্যানকে কেন্দ্র করে এক মারাত্মক বিতর্কের সূত্রপাত হয়। অভিযোগ ওঠে যে, রেজিনগরের একটি বিশেষ বুথে নাকি মোট ভোটারের সংখ্যার চেয়েও বেশি ভোট নিজেদের ঝুলিতে টেনেছে বিজেপি! এই বিস্ফোরক অভিযোগকে হাতিয়ার করে আসরে নামেন খোদ রাজ্যের হেভিওয়েট নেতারা, যা বঙ্গ রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এই রাজনৈতিক বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় রেজিনগর বিধানসভার অন্তর্গত ১০৯ নম্বর বুথ। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে একটি পোস্ট করে সরাসরি নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানান। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই ১০৯ নম্বর বুথে সর্বমোট ভোটারের সংখ্যা ছিল মাত্র ৭৭২ জন, অথচ সেই একই বুথে বিজেপি একাই নাকি পেয়েছে ৯০৯টি ভোট! অন্যদিকে, আমজনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ১টি ভোট। অভিষেকের এই পোস্টের পর খোদ তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তীব্র কটাক্ষ করে সংবাদমাধ্যমের সামনে জানান যে, পুলিশকে দিয়ে ভোট করালে এমন ছাপ্পা ভোটের ছবিই দেখতে পাওয়া যায়। যেখানে ভোটারের চেয়ে বেশি ভোট পড়ে, সেখানে আদৌ কোনো সুস্থ বা অবাধ নির্বাচন হয়েছে কি না, তা নিয়ে তিনি গভীর সংশয় প্রকাশ করেন।

শীর্ষ নেতৃত্বের তরফ থেকে এমন চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে আসার পরই দ্রুত আসরে নামে মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসন। রাজ্য রাজনীতিতে যখন এই ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ নিয়ে প্রবল শোরগোল চলছে, ঠিক তখনই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বিশদ পোস্ট করে সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটান মুর্শিদাবাদের জেলাশাসক তথা জেলা নির্বাচনী আধিকারিক (DEO)। প্রশাসনের তরফ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, সামাজিক মাধ্যমে করা এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং ভুয়ো। জেলা নির্বাচনী আধিকারিক প্রকৃত পরিসংখ্যান এবং সর্বশেষ ভোটার তালিকা জনসমক্ষে তুলে ধরে জানান যে, রেজিনগর উপনির্বাচনের ওই ১০৯ নম্বর বুথে মোট ভোটারের সংখ্যা ৭৭২ জন নয়, বরং নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী আসল সংখ্যাটি হলো ১১০৯ জন। এই ১১০৯ জন ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৫৭৫ এবং মহিলা ভোটারের সংখ্যা ৫৩৪ জন।
Jantar Mantar Viral Video: যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারী ভাইকে বকুনি মহিলা পুলিশের! হাসিতে মজল নেটপাড়া
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া এই সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভোটের দিন ওই নির্দিষ্ট ১০৯ নম্বর বুথে সর্বমোট ৯৭২টি ভোট পড়েছিল। অর্থাৎ, ১১০৯ জন ভোটারের মধ্যে ৯৭২ জন তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছিলেন, যা কোনোভাবেই মোট ভোটারের সংখ্যার চেয়ে বেশি নয় এবং এটি একটি স্বাভাবিক ভোটদানের হিসেব। প্রশাসনের এই রিপোর্ট সামনে আসার পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে। উল্লেখ্য, এবারের উপনির্বাচনে মমতা তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী মাত্র ৩৮৩৩ ভোট পেয়ে একেবারে চতুর্থ স্থানে নেমে গিয়েছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই চরম হতাশাজনক ফলাফলের পর দলের নেতৃত্ব যে ১০৯ নম্বর বুথের পরিসংখ্যানকে হাতিয়ার করে নির্বাচনে বেনিয়মের অভিযোগ প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, প্রশাসনের পাল্টা পরিসংখ্যানে সেই অস্ত্র কার্যত ভোঁতা হয়ে গেল। এর ফলে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছে শাসক শিবির।

ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যেকোনো তথ্য যাচাই না করেই খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, রেজিনগরের এই ঘটনাটি তার একটি অন্যতম জ্বলন্ত প্রমাণ। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পূর্ণ অধিকার সমস্ত রাজনৈতিক দলের রয়েছে, কিন্তু সেই অভিযোগ যদি অসম্পূর্ণ বা ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তা সাধারণ মানুষের মনে অযথা বিভ্রান্তি তৈরি করে। মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসনের এই দ্রুত পদক্ষেপ এবং স্বচ্ছ পরিসংখ্যান জনসমক্ষে প্রকাশ করার বিষয়টি প্রমাণ করে যে, নির্বাচন কমিশন নিজেদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে এবং গুজবের মোকাবিলা করতে সদা তৎপর। আগামী দিনে যেকোনো রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্ব জনসমক্ষে কোনো গুরুতর পরিসংখ্যান তুলে ধরার আগে তা কতটা সূক্ষ্মভাবে যাচাই করে নেবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। আপাতত ১০৯ নম্বর বুথের এই বিতর্কিত অধ্যায়ে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে যবনিকা পতন হলেও, রাজ্যের রাজনৈতিক পারদ এতে বিন্দুমাত্র নিম্নমুখী হয়নি।




