Rejinagar Bypoll: রেজিনগরে ঋত-তৃণমূল প্রার্থীর হয়ে প্রচারে এনসিপিআই সাংসদ আবু তাহের! ভাগ্নের জয়ে মরিয়া নেতা
KOLKATA: Rejinagar Bypoll বা মুর্শিদাবাদের রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে কার্যত প্রতিদিন নতুন নতুন নাটকীয় মোড় আসছে। এবার এই উপনির্বাচনের প্রচার পর্বে এক অভাবনীয় এবং চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক সমীকরণ সামনে এল। ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা এনসিপিআই (NCPI)-এর মুর্শিদাবাদের দাপুটে লোকসভা সাংসদ আবু তাহের খান এবার সরাসরি প্রচারে নামলেন অন্য একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর হয়ে! তিনি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘বিদ্রোহী তৃণমূল’ বা ঋত-তৃণমূল শিবিরের মনোনীত প্রার্থী সফিউজ্জামান শেখের হয়ে প্রকাশ্যেই সমর্থন জানাচ্ছেন এবং তাঁর হয়ে প্রচারের ময়দানে নামছেন। নিজের দল ছেড়ে অন্য একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর হয়ে একজন হেভিওয়েট সাংসদের এই অভাবনীয় প্রচার দেখে গোটা জেলার পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক মহলও রীতিমতো হতবাক। এই মেগা চমকের জেরে রেজিনগরের ভোটের অঙ্ক যে আরও বেশি জটিল হয়ে উঠল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

রেজিনগরের এই আজব রাজনৈতিক সমীকরণের নেপথ্যে রয়েছে এক গভীর পারিবারিক সম্পর্ক। জানা গিয়েছে, ঋত-তৃণমূল শিবিরের প্রার্থী সফিউজ্জামান শেখ আসলে সম্পর্কে এনসিপিআই সাংসদ আবু তাহের খানের আপন ভাগ্নে। সফিউজ্জামান মুর্শিদাবাদ জেলার রাজনীতিতে বেশ পরিচিত মুখ এবং বর্তমানে তিনি জেলা পরিষদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও তথ্য দপ্তরের কর্মাধ্যক্ষ পদে রয়েছেন। পেশায় শিক্ষক সফিউজ্জামান স্থানীয়দের কাছে ‘হাবিব মাস্টার’ নামেই সমধিক পরিচিত। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবির অত্যন্ত সুকৌশলে আবু তাহেরের ভাগ্নেকে টিকিট দিয়ে মুর্শিদাবাদের মাটিতে নিজেদের সংগঠন মজবুত করার চাল চেলেছে। আর সেই পারিবারিক টান এবং স্নেহের বশেই সাংসদ আবু তাহের নিজের রাজনৈতিক দলের বিধিনিষেধ পরোয়া না করেই ভাগ্নের সমর্থনে মাঠে নেমে পড়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আবু তাহের খানের মতো একজন প্রভাবশালী নেতার প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকায় সফিউজ্জামান শেখ এই নির্বাচনে বাড়তি রাজনৈতিক সুবিধা বা মাইলেজ পেতে চলেছেন।
সাংসদ আবু তাহের খানের এই প্রকাশ্য দলবিরোধী অবস্থান এবং অন্য দলের প্রার্থীর হয়ে প্রচার করা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বিস্তর রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই সমস্ত বিতর্কের মুখে দাঁড়িয়ে আবু তাহের খান এক চাঞ্চল্যকর এবং বিস্ফোরক সাফাই দিয়েছেন। তিনি প্রকাশ্যে সংবাদমাধ্যমের সামনে জানিয়েছেন যে, “আমার ভাগ্নে ভোটে দাঁড়িয়েছে, আমি অবশ্যই আশা করব সে জিতুক। আমি যখন প্রচারে যাব, তখন মানুষের কাছে প্রকাশ্যেই বলব যে আমি কার হয়ে এবং ঠিক কেন প্রচারে এসেছি।” তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন যে, বিজেপি এবং আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (AJUP) উভয়েই তাঁদের প্রধান রাজনৈতিক শত্রু, কারণ এরা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে। রেজিনগরে যাতে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির জয় হয় এবং অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই সফিউজ্জামানকে প্রার্থী করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন। ভাগ্নেকে জেতানোর জন্য তিনি সবরকম চেষ্টা করবেন বলেও প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আবু তাহের।

অন্যদিকে, এই উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘কালীঘাট তৃণমূল’ বা মূল তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে প্রাক্তন বিধায়ক রবিউল আলম চৌধুরীকে প্রার্থী করা হয়েছে। ফলে রেজিনগরের মাটিতে এবার আক্ষরিক অর্থেই তৃণমূল বনাম তৃণমূলের এক মেগা লড়াই বা গৃহযুদ্ধ দেখতে চলেছে সাধারণ মানুষ। এর পাশাপাশি রেজিনগর বিধানসভা আসনটি খালি হওয়ার মূল কারণ হিসেবে রয়েছে এজেউপি (AJUP) নেতা হুমায়ুন কবীরের সিদ্ধান্ত। গত বিধানসভা নির্বাচনে হুমায়ুন কবীর রেজিনগর এবং নওদা—উভয় কেন্দ্র থেকেই জয়লাভ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি নওদা আসনটি নিজের কাছে রেখে রেজিনগর থেকে ইস্তফা দেওয়ায় এই উপনির্বাচন অনিবার্য হয়ে পড়ে। বর্তমানে এই শূন্য আসনে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন হুমায়ুন কবীরের নিজের ছেলে গোলাম নবী আজাদ রবিন। সব মিলিয়ে রেজিনগরের ময়দানে একদিকে যেমন তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, তেমনই অন্যদিকে পারিবারিক রাজনীতির এক চূড়ান্ত ককটেল তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: Rajya Sabha Election: বাংলা-সহ তিন রাজ্যে রাজ্যসভা নির্বাচনের দিন ঘোষণা! ১৬ অক্টোবর উপনির্বাচন
আগামী ৬ অক্টোবর রেজিনগর এবং নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে বহু প্রতীক্ষিত উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে এবং ফলাফল ঘোষণা হবে ৯ অক্টোবর। ভোটগ্রহণের দিন যত এগিয়ে আসছে, রেজিনগরের রাজনৈতিক উত্তাপ ততই মারাত্মক আকার ধারণ করছে। নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে ইতিমধ্যেই মূল তৃণমূলের ‘জোড়া ফুল’ প্রতীকটি ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির পেয়েছে ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক এবং ঋতব্রত শিবির লড়ছে ‘খাম’ বা এনভেলপ প্রতীকে। এই চরম বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত কাকে তাদের আসল প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নেবে, তা নিয়ে বিস্তর জল্পনা রয়েছে। তবে এনসিপিআই সাংসদ আবু তাহের খানের এই অবাক করা ভেলকি এবং ভাগ্নের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য পক্ষপাতিত্ব যে রেজিনগরের ভোটবাক্সে বড়সড় প্রভাব ফেলতে চলেছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আপাতত মুর্শিদাবাদের এই হাই-ভোল্টেজ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের দিকেই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে গোটা বাংলা।




