Supreme Court ECI Video: ভোটগণনার ভিডিও হারিয়ে যাওয়ার দায়ে নির্বাচন কমিশনকে তীব্র ভর্ৎসনা সুপ্রিম কোর্টের, কড়া হুঁশিয়ারি আদালতের
রিপোর্ট: কিংশুক সিংহ রায়
New Delhi: গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখার দায়িত্বে থাকা ভারতের নির্বাচন কমিশন যদি নিজেদের হেফাজত থেকেই ভোটের মতো সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড হারিয়ে ফেলার কথা বলে, তবে তা যে অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং অবিশ্বাস্য, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সম্প্রতি ২০২৩ সালের কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনের একটি অত্যন্ত বিতর্কিত কেন্দ্রের ভোট গণনার অফিশিয়াল ভিডিও ফুটেজ কমিশনের কাছে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না—আদালতে এই তথ্য পেশ করার পরেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরা। বিচারপতি সঞ্জয় কুমার এবং বিচারপতি সঞ্জীব সচদেবার গড়া ডিভিশন বেঞ্চ এই অজুহাতকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে তোপ দেগে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, সংবিধান স্বীকৃত এই সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এমন যুক্তিহীন ও অগ্রহণযোগ্য সাফাই কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।
আইনজীবীর মুখে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য শোনার পরেই স্তম্ভিত হয়ে যায় সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ। বিচারপতিরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ সুরে প্রশ্ন তোলেন যে, নির্বাচন আয়োজন করাই যে সংস্থার একমাত্র মূল কাজ, তারা কীভাবে নিজেদের সংরক্ষণাগার থেকে এই ধরনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল তথ্য বা ভিডিও রেকর্ড খুইয়ে ফেলতে পারে? যেখানে প্রতিটি বুথ এবং গণনা কেন্দ্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সযত্নে সংরক্ষণ করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেখানে আদালতের অন্দরে দাঁড়িয়ে এই ধরনের হালকা বক্তব্য পেশ করা নজিরবিহীন। আদালত কমিশনকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছে যে, পরবর্তী শুনানির দিন এই সংক্রান্ত সমস্ত নথি বা প্রমাণ এজলাসে পেশ করতে হবে, নতুবা কমিশন ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন করছে ধরে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর বিরূপ সিদ্ধান্ত বা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

মূলত কর্ণাটকের শৃঙ্গেরী বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই এই আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত ঘটেছিল। ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস প্রার্থী টিডি রাজেগৌড়া অত্যন্ত কম ব্যবধানে বিজেপির ডিএন জীবরাজকে পরাজিত করেছিলেন, কিন্তু পরাজয়ের সেই ব্যবধানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতে পিটিশন দাখিল করেছিলেন পরাজিত প্রার্থী। পরবর্তীতে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে হাইকোর্টের নির্দেশে যখন বিতর্কিত ও খারিজ হওয়া শত শত পোস্টাল ব্যালট পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন করে গণনা করা হয়, তখন ভোটের সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যায়। মে মাসে রিটার্নিং অফিসার সংশোধিত ফলাফল ঘোষণা করে জানান যে কংগ্রেস প্রার্থীর ভোট বেশ কিছুটা কমে গেছে এবং বিজেপি প্রার্থী জয়ী হয়েছেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
এই নজিরবিহীন পদক্ষেপে বিধায়ক পদ খুইয়ে তড়িঘড়ি সুপ্রিম কোর্টের দারস্থ হন কংগ্রেস নেতা, এবং পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা যাচাই করার জন্যই ২০২৩ সালের মূল গণনার ভিডিও ফুটেজ ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তলব করার আবেদন জানান। অথচ সেই ভিডিও আদালতে জমা দেওয়ার সময়ই নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে মূল রেকর্ডটি তারা খুঁজে পাচ্ছে না। এর আগে পোস্টাল ব্যালটে কারচুপি ও গরমিল করার অভিযোগে বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা পর্যন্ত দায়ের হয়েছিল, যদিও পরে হাই কোর্ট তাতে স্থগিতাদেশ দেয়। এখন ঠিক সেই জটিল ও স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে কমিশনের পক্ষ থেকে ভিডিও হারিয়ে যাওয়ার এই তত্ত্ব সামনে আসায় গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে, নির্বাচন কমিশনের এই ধরনের দায়সারা ও অসতর্ক মনোভাব দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিচ্ছে। আগামী ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই মামলার পরবর্তী নির্দিষ্ট শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে, তবে তার আগেই সমস্ত ডিজিটাল প্রমাণ ও ভিডিও রেকর্ডিং আদালতের নজরে আনার জন্য কমিশনকে চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের এই কঠোর অবস্থানের পর নির্বাচন কমিশন কীভাবে তাদের হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করে এবং আদালতের প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়। গণতন্ত্রের পবিত্র উৎসবের স্বচ্ছতা রক্ষা যেখানে প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্তব্য, সেখানে এমন গাফিলতি যে দেশের বিচার ব্যবস্থাকেও ক্ষুব্ধ করেছে, তা আজকের এই ভর্ৎসনার মধ্য দিয়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো।




