Suvendu Adhikari Medinipur Puja: জনরোষ ও আন্দোলনের চাপে কোণঠাসা মুখ্যমন্ত্রী, মেদিনীপুরে বিরোধীদের ‘আরশোলা’ আক্রমণ নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক
রিপোর্ট: কিংশুক সিংহ রায়
Medinipur: রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জনরোষ, তীব্র আন্দোলন এবং একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগের মুখে পড়ে সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব কতটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে, মেদিনীপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য তারই এক স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটিয়েছে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ ও লাগাতার আন্দোলনের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়েই কি তবে শাসক শিবির এই ধরনের আক্রমণাত্মক ও চ্যুত ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করেছে—এই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক মহলে জোরালোভাবে উঠতে শুরু করেছে। কাঁথির ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের পুজো মণ্ডপে এসে মা দুর্গার আরাধনা করার আড়ালে যেভাবে বিরোধীদের উদ্দেশ্যে বিষোদ্গার করা হয়েছে, তা আদতে প্রশাসনের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক গভীর আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতারই করুণ চিত্র ফুটিয়ে তোলে। রাজ্যে যখন একের পর এক গণআন্দোলন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, ঠিক তখনই খোদ মুখ্যমন্ত্রীর এমন অসহিষ্ণু ও আক্রমণাত্মক রূপ তাঁর রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকেই নতুন করে উন্মোচন করে দিয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
তীব্র জনরোষ এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা করতেই যে মুখ্যমন্ত্রী আজ এই ধরনের মরিয়া পথ বেছে নিয়েছেন, তা আর কারোরই অজানা নয়। সম্প্রতি ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের দাবিতে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যেভাবে রাজপথ কাঁপিয়ে তুলছে, তাতে প্রশাসনের ভিত নড়ে গেছে। সেই গণআন্দোলন ও প্রতিবাদের ঝড়কে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে শাসক পক্ষ এখন মরিয়া হয়ে কটূক্তি ও অবমাননাকর শব্দের আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। ‘আরশোলা’ বা এজাতীয় নিম্নুচ মানসিকতার উপমা ব্যবহার করে আদতে তাঁরা নিজেদের ব্যর্থতা ও জনগণের চোখের মণি হয়ে ওঠার আতঙ্ককেই ঢাকতে চাইছেন। যে জনসমর্থন বা আস্থার জোরে সরকারে আসার কথা ছিল, আজ তা হারিয়ে ফেলার ভয়ে প্রশাসন এতটাই তটস্থ যে সামান্য সমালোচনা শুনলেই তাদের গাত্রদাহ শুরু হয়ে যাচ্ছে।

বিরোধী দলগুলোর লাগাতার আন্দোলন ও রাজপথের চাবুক মারা কর্মসূচির জেরে সরকারের অন্দরে যে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, এদিনের মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে তা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। সাধারণ মানুষ যখন সরকারি ব্যর্থতা, বেকারত্ব, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক পচন নিয়ে রাস্তায় নেমে জবাব চাইছে, তখন সেই নায্য দাবিগুলোকে দমন করার জন্য পুলিশি কড়াকড়ি ও ১৪৪ ধারা জারির মতো কালাকানুন প্রয়োগ করা হচ্ছে। অথচ এতকিছুর পরেও যখন জনতার স্রোত থামানো যাচ্ছে না, তখন প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে বা পুজো মণ্ডপের পবিত্র প্রাঙ্গণ থেকে রাজনৈতিক শালীনতার সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করে এই ধরনের অপমানজনক মন্তব্য করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন দায়িত্বশীল পদে থেকে এই ধরনের ভাষা প্রয়োগ করা কেবল পদমর্যাদার পরিপন্থীই নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে বর্তমান প্রশাসন জনগণের শক্তির সামনে কতটা অসহায় বোধ করছে।
গণতন্ত্রের মূল কথাই হলো সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা এবং জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, কিন্তু বর্তমান সরকারের কার্যকলাপে তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় না। রাজ্যে সংঘটিত বিভিন্ন দুর্নীতির বিরুদ্ধে যখন সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠেছে, তখন তাদের কন্ঠস্বর রোধ করার জন্য হুমকি, ধমক এবং দমনপীড়নের পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে যে স্বৈরাচারী মনোভাব ও ভয়ের রাজত্ব দিয়ে কখনোই মানুষের প্রতিবাদের স্বর চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া যায় না। মেদিনীপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে বিরোধীদের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ ও হতাশা উগরে দেওয়া হয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট যে সরকারের ক্ষমতার আসন এখন মারাত্মকভাবে কাঁপছে। জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ থেকে বাঁচতেই আজ এই ধরনের মরিয়া আক্রমণাত্মক কৌশল নেওয়া হচ্ছে, যা তাদের রাজনৈতিক পতনেরই পূর্বলক্ষণ মাত্র।

সব মিলিয়ে, মেদিনীপুরের পুজো মণ্ডপ থেকে যেভাবে রাজনৈতিক শালীনতা বিসর্জন দিয়ে বিরোধীদের আক্রমণ করা হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের মনে সরকারের প্রতি ঘৃণা ও ক্ষোভ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভয়ের রাজনীতি এবং দমনপীড়নের নীতি দিয়ে মানুষের নায্য অধিকার আদায়ের লড়াইকে দমিয়ে রাখা যাবে না, কারণ আজ আপামর জনসাধারণ বুঝে গেছে যে এই সরকার তাদের স্বার্থ রক্ষায় সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আগামী দিনে এই গণরোষ আরও তীব্র আকার ধারণ করবে এবং ব্যালট বা রাজপথের লড়াইয়ে এই অহংকার ধূলিস্যাৎ হয়ে যাবে। জনগণের মৌলিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর লাগাতার এই আঘাতের জবাব বাংলার মানুষ উপযুক্ত সময়ে কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেবে, আর সেই দিনের অপেক্ষাতেই এখন পথ চেয়ে রয়েছে সমগ্র রাজ্যবাসী।




