Vande Mataram: বন্দে মাতরম পুরো না গাইলে জেল বা জরিমানা নয়, শুনানিতে বড় পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের

Published:

Vande Mataram: বন্দে মাতরম পুরো না গাইলে জেল বা জরিমানা নয়, শুনানিতে বড় পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের

NEW DELHI: Vande Mataram বা দেশের জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’ সম্পূর্ণ গাওয়া নিয়ে এবার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ করল দেশের সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস বা বিবেকের কারণে এই গানটি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে গাইতে অস্বীকার করেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কোনোভাবেই ফৌজদারি মামলা দায়ের করা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে সরকারি অনুষ্ঠানগুলিতে ‘বন্দে মাতরম’-এর দু’টি স্তবকের পরিবর্তে সম্পূর্ণ ছ’টি স্তবকই গাওয়া বাধ্যতামূলক করে একটি নির্দেশিকা জারি করা হয়েছিল। এই আইনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেই সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছিলেন প্রখ্যাত কর্ণাটকী সঙ্গীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণ (T M Krishna)। তাঁর সেই মামলার শুনানিতেই মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের এই মেগা রায় বা পর্যবেক্ষণ সামনে এসেছে, যা দেশের রাজনৈতিক এবং আইনি পরিমণ্ডলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

Advertisement Andaman Vibes

এই মেগা মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেছে। শুনানিপর্বে বিচারপতি বাগচী ঐতিহাসিক ১৯৮৬ সালের ‘বিজোয় ইম্যানুয়েল’ মামলার রায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, সেই পুরনো রায়ে শীর্ষ আদালত যেমনটা জানিয়েছিল, কেউ যদি নিজের বিচারবুদ্ধি বা ধর্মীয় ভাবাবেগের কারণে জাতীয় সঙ্গীত বা গান গাওয়া থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেন, তবে তাঁকে কোনোভাবেই জোর করা বা সাজা দেওয়া যাবে না। আদালত আরও জানিয়েছে যে, ‘বন্দে মাতরম’-ই যে ভারতের জাতীয় গান, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নতুন করে কিছু বলার নেই, কিন্তু কাউকে সেটি গাইতে বাধ্য করা হলে তা সংবিধানের ২৫ ও ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে কি না, সেটাই প্রধান বিচার্য বিষয়। এক্ষেত্রে ধর্মীয় কারণে গানটি না গাইলে জেল বা জরিমানার মতো ফৌজদারি শাস্তির মুখে পড়তে হবে না বলেই আদালত কার্যত স্পষ্ট করে দিয়েছে।

আরও পড়ুন: Sabina Yasmin: কালিয়াচক থানায় সাবিনা ইয়াসমিনকে তলব এনআইএ-র! প্রাক্তন মন্ত্রীকে ঘিরে মালদহে মেগা চাঞ্চল্য 

মামলাকারী প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণের হয়ে আদালতে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী এস মুরলীধর। তিনি তাঁর যুক্তিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘বন্দে মাতরম’-এর মোট ছ’টি স্তবকের মধ্যে শেষের চার স্তবকে হিন্দু দেব-দেবী বিশেষ করে দুর্গা, লক্ষ্মী এবং সরস্বতীর অত্যন্ত স্পষ্ট বন্দনা বা উল্লেখ রয়েছে। তাই ভারতের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশে কোনো ভিন্ন ধর্মাবলম্বী নাগরিককে যদি এই সম্পূর্ণ ছ’টি স্তবক গাইতে আইনিভাবে বাধ্য করা হয়, তবে তা দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার মৌলিক কাঠামোর চরম পরিপন্থী হবে। ২০২৬ সালে সংশোধিত ‘প্রিভেনশন অফ ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার অ্যাক্ট, ১৯৭১’ (Prevention of Insults to National Honour Act, 1971)-এর নতুন ধারা এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সাম্প্রতিক নির্দেশিকাকে এই যুক্তিতেই চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে। আইনজীবীর দাবি, এই সংশোধনীতে ‘জাতীয় গান’ আসলে কোনটি, তার কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি, যার ফলে ভবিষ্যতে এই আইনের চরম অপব্যবহার হওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

Advertisement Burger4u

শুনানি চলাকালীন দেশের শীর্ষ আদালতের এজলাসে রীতিমতো এক মেগা তর্কযুদ্ধ এবং চরম বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের হয়ে এই মামলার তীব্র বিরোধিতা করে সওয়াল করতে ওঠেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তিনি আবেদনকারীর যুক্তির বিরোধিতা করে বলেন যে, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা এতটা সংকীর্ণ বা ছোট হতে পারে না। এই আইনি তর্ক চলাকালীনই তুষার মেহতা হঠাৎ করে বলে বসেন যে, যাঁরা আইনের শাসন মানেন না এবং যাঁদের মধ্যে একটি বিশেষ ‘নকশাল মানসিকতা’ রয়েছে, দেশের জাতীয় গান নিয়ে প্রশ্ন তোলা তাঁদেরই স্বভাব। তাঁর মুখে এই ‘নকশাল’ শব্দটি শোনা মাত্রই তীব্র আপত্তি ও ক্ষোভে ফেটে পড়েন মামলাকারীর আইনজীবী এস মুরলীধর। তিনি এটিকে একজন সরকারি আইনজীবীর পক্ষে অত্যন্ত বেমানান বলে উল্লেখ করেন এবং অবিলম্বে এই অবমাননাকর মন্তব্যটি প্রত্যাহার করার জোর দাবি জানান। কিন্তু সলিসিটর জেনারেল নিজের বক্তব্যে সম্পূর্ণ অনড় থেকে জানিয়ে দেন যে, তিনি কোনোমতেই ক্ষমা চাইবেন না বা তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করবেন না।

আরও পড়ুন: Humayun Kabir: পুলিশের সামনেই মুকুন্দপুরে আক্রান্ত হুমায়ুন কবীর! পার্টি অফিস দখল ঘিরে ধুন্ধুমার 

দুই প্রবীণ আইনজীবীর মধ্যে দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা এই বেনজির ও উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডার পর সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়। আদালত পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করার পর জানায় যে, আইনজীবীদের মধ্যে এই উত্তপ্ত বাদানুবাদ এবং মন্তব্যগুলিকে তারা তাদের আনুষ্ঠানিক রেকর্ডে বা বিচার্য বিষয়ের নথিতে অন্তর্ভুক্ত করছে না। আপাতত এই মামলার কোনো চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়নি, তবে সুপ্রিম কোর্ট এই গোটা বিষয়টি নিয়ে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে তাদের আনুষ্ঠানিক জবাব তলব করেছে। কেন্দ্রের জবাব পাওয়ার পরেই এই মেগা মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। তবে এটা স্পষ্ট যে, বন্দে মাতরমের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং আবেগমথিত একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে এই আইনি লড়াই আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে বড়সড় প্রভাব ফেলতে চলেছে। আগামী শুনানিতে শীর্ষ আদালত ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং জাতীয়তাবাদের এই সূক্ষ্ম সীমারেখাকে কীভাবে বিচার করে, এখন সেদিকেই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশ।

Advertisement

Kingshuk Singha Roy
Kingshuk Singha Roy
Founder & Editor-in-Chief বাংলার আওয়াজের প্রতিষ্ঠাতা। ২০১৭ সাল থেকে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের সাথে যুক্ত। সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল মিডিয়া নিয়ে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

Related articles

spot_img

Recent articles

spot_img