Narendra Modi: চা-বিক্রেতা থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী! ৭৬তম জন্মদিনে ফিরে দেখা নরেন্দ্র মোদীর বর্ণময় রাজনৈতিক জীবন
NEW DELHI: আজ ১৭ সেপ্টেম্বর, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) ৭৬তম জন্মদিন। গুজরাটের একটি ছোট্ট শহর ভাদনগরের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে দেশের সর্বোচ্চ শাসন ক্ষমতায় আসীন হওয়ার তাঁর এই যাত্রাপথ ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। তাঁর এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন যেমন অজস্র সাফল্যে মোড়া, তেমনই বিভিন্ন সময়ে তাঁকে পেরোতে হয়েছে কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। জন্মদিনের এই বিশেষ লগ্নে ‘বাংলার আওয়াজ’-এর পক্ষ থেকে ফিরে দেখা হলো তাঁর সেই বর্ণময় রাজনৈতিক যাত্রাপথ, যা ভারতের ভবিষ্যৎ রূপরেখাকে অনেকটাই পালটে দিয়েছে।
শৈশব ও আরএসএস-এ (RSS) যোগদান
১৯৫০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর গুজরাটের মেহসানা জেলার ভাদনগরে দামোদরদাস মূলচাঁদ মোদী এবং হীরাবেন মোদীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে ভাদনগর রেলওয়ে স্টেশনে চা বিক্রি করতেন তিনি। কৈশোর থেকেই তাঁর মধ্যে দেশপ্রেম এবং আধ্যাত্মিকতার প্রতি এক গভীর টান লক্ষ্য করা যায়। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) সংস্পর্শে আসেন। লক্ষণরাও ইনামদারের (যাঁকে তিনি তাঁর রাজনৈতিক গুরু মানেন) হাত ধরেই তাঁর সংঘে প্রবেশ। তরুণ বয়সে সন্ন্যাসী হওয়ার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে তিনি বাড়ি ছাড়েন এবং হিমালয় থেকে শুরু করে রামকৃষ্ণ মিশন-সহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে বেড়ান। এরপর ১৯৭১ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আরএসএস-এর পূর্ণ সময়ের প্রচারক হিসেবে কাজে যোগ দেন।

জরুরি অবস্থা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ
১৯৭৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেশে জরুরি অবস্থা জারি করলে নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক জীবনে এক নতুন মোড় আসে। আরএসএস নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পর তিনি ছদ্মবেশে আত্মগোপন করে জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করেন। লিফলেট বিলি করা থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতাদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া—এই সময়ে তাঁর অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতা আরএসএস নেতৃত্বের নজর কাড়ে।
বিজেপিতে উত্থান ও জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ
তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতার কারণে ১৯৮৫ সালে আরএসএস তাঁকে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (BJP) নিযুক্ত করে। ১৯৮৭ সালে তিনি গুজরাট বিজেপির সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) পদে আসীন হন। ১৯৯০ সালে লালকৃষ্ণ আদবানির ঐতিহাসিক রাম রথযাত্রা এবং ১৯৯১ সালে মুরলি মনোহর যোশীর একতা যাত্রার অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মোদী। তাঁর রণকৌশলেই ১৯৯৫ সালে গুজরাটে বিজেপি প্রথমবারের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে ক্ষমতায় আসে। এরপর তাঁকে জাতীয় রাজনীতিতে নিয়ে আসা হয় এবং তিনি বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বিভিন্ন রাজ্যের দায়িত্ব অত্যন্ত সফলভাবে পালন করেন।

গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী এবং ‘গুজরাট মডেল’
২০০১ সালে গুজরাটে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কেশুভাই প্যাটেলের পদত্যাগের কারণে নরেন্দ্র মোদীকে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন করা হয়। ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর তিনি প্রথমবারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই ২০০২ সালে গোধরা কাণ্ড এবং তৎপরবর্তী গুজরাট দাঙ্গা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং বিতর্কের সৃষ্টি করে। বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুললেও, পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে গঠিত সিট (SIT) তাঁকে এই মামলা থেকে ক্লিনচিট দেয়।
দাঙ্গার পর তিনি গুজরাটের অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেন। ভাইব্র্যান্ট গুজরাট (Vibrant Gujarat) সামিটের মাধ্যমে তিনি দেশ-বিদেশের বিনিয়োগকারীদের রাজ্যে টেনে আনেন। কৃষি থেকে শুরু করে পরিকাঠামো—প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুজরাটের এই অভাবনীয় অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সারা দেশের কাছে ‘গুজরাট মডেল’ নামে পরিচিতি লাভ করে। টানা চারবার তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিজেপির সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতায় পরিণত হন।

২০১৪ সালের ঐতিহাসিক জয় ও দিল্লির মসনদ
তাঁর ‘গুজরাট মডেল’-এর আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তার ওপর ভর করেই ২০১৩ সালে বিজেপি তাঁকে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের জন্য দলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে। “আবকি বার মোদী সরকার” এবং “অচ্ছে দিন”-এর স্লোগান তুলে তিনি সারা দেশে এক অভূতপূর্ব মোদী-হাওয়া তৈরি করেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি ২৮২টি আসন জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে, যা বিগত ৩০ বছরে প্রথমবার কোনো দলের জন্য সম্ভব হয়েছিল। ২৬ মে ২০১৪ তারিখে তিনি ভারতের ১৪তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
প্রথম দফার প্রধানমন্ত্রিত্ব: সংস্কার ও জনকল্যাণ (২০১৪-২০১৯)
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম মেয়াদ ছিল একগুচ্ছ যুগান্তকারী এবং কিছু ক্ষেত্রে বিতর্কিত সিদ্ধান্তে ভরা। পরিচ্ছন্ন ভারত গড়ার লক্ষ্যে তিনি চালু করেন ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান’। দেশের প্রতিটি মানুষকে ব্যাঙ্কিং পরিষেবার আওতায় আনতে ‘প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনা’, গরিব মহিলাদের জন্য ‘উজ্জ্বলা যোজনা’, এবং স্বাস্থ্যবিমার জন্য ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর মতো মেগা প্রকল্প চালু করেন তিনি।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেন। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর হঠাৎ করে পুরনো ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের (Demonetization) সিদ্ধান্ত সারা দেশে আলোড়ন ফেলে দেয়। এরপর ২০১৭ সালে সারা দেশে এক কর ব্যবস্থা চালু করতে নিয়ে আসেন জিএসটি (GST)। বিদেশনীতির ক্ষেত্রেও তাঁর পদক্ষেপ ছিল চোখে পড়ার মতো। উরি হামলার পর সার্জিক্যাল স্ট্রাইক এবং পুলওয়ামা হামলার পর বালাকোট এয়ার স্ট্রাইকের মাধ্যমে তিনি পাকিস্তানকে কড়া বার্তা দেন, যা তাঁর ‘শক্তিশালী নেতা’-র ইমেজকে আরও মজবুত করে।

দ্বিতীয় দফার সরকার: প্রতিশ্রুতি পালন ও করোনা মোকাবিলা (২০১৯-২০২৪)
জাতীয়তাবাদের প্রবল হাওয়া এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোর সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ৩০৩টি আসন জিতে আরও বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরে। দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই তিনি দলের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করেন। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা বিলোপ করা হয় এবং রাজ্যটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়। এরপর সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভিত্তিতে অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের পথ প্রশস্ত হয়। এছাড়াও তিন তালাক প্রথা নিষিদ্ধ করার মতো ঐতিহাসিক বিল পাশ হয় তাঁর আমলে।
২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ মহামারীর প্রকোপ শুরু হলে তিনি লকডাউন জারি করেন। ভারতের মতো বিশাল দেশে করোনা মোকাবিলা করা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করোনা ভ্যাকসিন দেশবাসীকে দেওয়ার পাশাপাশি ‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’ উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্বের বহু দেশে তা বিনামূল্যে সরবরাহ করে ভারত আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। এই মেয়াদেই ভারত জি-২০ (G20) সম্মেলনের সফল আয়োজন করে এবং চন্দ্রযান-৩ চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফলভাবে অবতরণ করে ভারতের মহাকাশ গবেষণায় নতুন ইতিহাস রচনা করে।
তৃতীয় টার্ম এবং ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন (২০২৪-বর্তমান)
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে টানা তৃতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে জওহরলাল নেহরুর রেকর্ড ছুঁয়েছেন তিনি। বর্তমানে তাঁর সরকারের মূল লক্ষ্য হলো ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করা, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’ (Viksit Bharat 2047)। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ভাষায় তাঁর এই অর্থনৈতিক নীতি বা ‘মোদীনমিক্স’-এর ওপর ভর করেই ভারত আজ বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই তা তৃতীয় স্থানে পৌঁছানোর লক্ষ্যে এগোচ্ছে।
নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক জীবন কেবল একটি ক্ষমতার রদবদল নয়, এটি ভারতীয় রাজনীতির এক সম্পূর্ণ প্যারাডাইম শিফট। তিনি যেমন তাঁর সমর্থকদের কাছে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনেতা, তেমনই বিরোধীদের কাছে তিনি মেরুকরণের রাজনীতির প্রতীক। সমালোচনা এবং বিতর্ক তাঁর ছায়াসঙ্গী হলেও, তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং জনসমর্থন তাঁকে আধুনিক ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী নেতায় পরিণত করেছে। চা-দোকান থেকে শুরু করে রাইসিনা হিলসের এই দীর্ঘ যাত্রাপথ প্রমাণ করে যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সদিচ্ছা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে যেকোনো অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। ৭৬তম জন্মদিনে ‘বাংলার আওয়াজ’-এর তরফ থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।



