Fake Doctors: রাজ্যে ভুয়ো ডাক্তার রুখতে কড়া স্বাস্থ্য কমিশন! হাসপাতাল ও নার্সিংহোমগুলির গাফিলতি ঠেকাতে কড়া নির্দেশিকা জারি
KOLKATA: রাজ্যে একের পর এক ভুয়ো চিকিৎসকের (Fake Doctors) পর্দাফাঁস হওয়ার পর এবার কড়া অবস্থান গ্রহণ করল পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক কমিশন (West Bengal Clinical Establishment Regulatory Commission – WBCERC)। বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমগুলিতে চিকিৎসার নামে কোনও রকম গাফিলতি, অতিরিক্ত বিলিং বা ভুয়ো চিকিৎসকের অনুপ্রবেশ রুখতে একগুচ্ছ নতুন ও কড়া নির্দেশিকা জারি করল কমিশন। সাম্প্রতিক সময়ে ১০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে ডাক্তারি রেজিস্ট্রেশন নম্বর বিক্রি এবং প্রায় ৫০০ ভুয়ো ডাক্তারের রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে আসার পরই নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য প্রশাসন।
কীভাবে ফাঁস হল ভুয়ো ডাক্তারদের এই বিশাল র্যাকেট?
সম্প্রতি দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরের ঘাসিয়াড়া এলাকা থেকে এক ভুয়ো চিকিৎসককে গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই প্রতারক নিজেকে ‘অঙ্কোলজিস্ট’ বা ক্যানসার বিশেষজ্ঞ বলে দাবি করত এবং রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করত। তাঁর বিরুদ্ধে এমবিবিএস (MBBS), এফআরসিএস (FRCS)-সহ একাধিক ভুয়ো ডিগ্রি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। শুধু সোনারপুর নয়, গত কয়েক সপ্তাহে কলকাতা ও শহরতলির একাধিক জায়গা থেকে এমন বেশ কয়েকজন ভুয়ো ডাক্তারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর পরেই রাজ্যের বিভিন্ন চিকিৎসক সংগঠন সরব হয়।
অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিং হোমের সম্পাদক ডা. রাজীব পাণ্ডে একটি বিস্ফোরক দাবি করে জানিয়েছেন যে, বর্তমানে রাজ্যজুড়ে অন্তত ৫০০ জন ভুয়ো ডাক্তার ছড়িয়ে রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ক্যান্ডিডেট পিছু প্রায় দশ লক্ষ টাকার বিনিময়ে মিলেছে এই রেজিস্ট্রেশন নম্বর। এই চিকিৎসকদের নামের পাশে এমবিবিএস, এমডি-র মতো ডিগ্রি লেখা থাকলেও, এঁদের অনেকেই জীবনে কোনওদিন ডাক্তারি বা নিট (NEET) পরীক্ষাতেই বসেননি। ভিনরাজ্য থেকে ভুয়ো ডিগ্রি জোগাড় করে তা ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিলে দেখিয়ে এবং ‘ঘুষ’ দিয়ে এঁরা রেজিস্ট্রেশন নম্বর সংগ্রহ করেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন
এই ঘটনায় সরাসরি কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিলকে। অভিযোগ, এই কাণ্ডের নেপথ্যে মেডিক্যাল কাউন্সিলের একটি বিশাল চক্র জড়িত রয়েছে এবং এর সঙ্গে মাথাদেরও যোগসাজশ থাকতে পারে। পরিস্থিতি সামলাতে ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে চিঠি দিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিং হোম। ডা. রাজীব পাণ্ডে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হলে অবিলম্বে মেডিক্যাল কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্টকে তাঁদের পদ থেকে সরাতে হবে।
চিকিৎসক সংগঠনগুলোর দাবি, গত ১৫ বছর ধরে মেডিক্যাল কাউন্সিলের সদস্যরা ঘুষ নিয়ে ভুয়ো ডিগ্রি সার্টিফিকেট তৈরি করে দিচ্ছেন। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এই বিশাল দুর্নীতির ফলে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। অ্যাসোসিয়েশন অব হেলথ সার্ভিস ডক্টরসের সম্পাদক ডা. উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, ভুয়ো ডাক্তারের সংখ্যাটা বাস্তবে আরও অনেক গুণ বেশি হতে পারে।
আরও পড়ুন: CPM Book Stall: পুজোয় সিপিএমের স্টল করতে দেবেন না শঙ্কুদেব! ভিন্ন অবস্থানে বিজেপি নেতা সজল ঘোষ
স্বাস্থ্য কমিশনের কড়া নির্দেশিকা এবং হাসপাতালগুলোর দায়িত্ব
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবিলায় এবার সরাসরি আসরে নেমেছে পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক কমিশন। কমিশনের পক্ষ থেকে রাজ্যের সমস্ত বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোম, প্যাথলজিক্যাল ল্যাব এবং ক্লিনিকগুলোর জন্য বেশ কিছু কঠোর নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে:
প্রথমত, সমস্ত বেসরকারি ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্টকে তাদের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক চিকিৎসকের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং মেডিক্যাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশন নম্বর নতুন করে ভেরিফাই বা যাচাই করতে হবে। কোনও চিকিৎসক নিয়োগ করার আগে তাঁর আসল শংসাপত্র খতিয়ে দেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, চিকিৎসায় গাফিলতি বা ‘মেডিক্যাল নেগ্লিজেন্স’-এর ক্ষেত্রে কমিশন এখন থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করবে। কোনও নার্সিংহোম বা হাসপাতালের বিরুদ্ধে ভুয়ো ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করানোর অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স অবিলম্বে বাতিল করা হতে পারে এবং কড়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তৃতীয়ত, কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে যে, রোগী ভর্তির সময় অতিরিক্ত টাকা দাবি করা বা অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করিয়ে বিল বাড়ানোর প্রবণতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

২০১৭ সালের সিআইডি তদন্তের প্রসঙ্গ
রাজ্যে ভুয়ো ডাক্তারের রমরমা এই প্রথম নয়। ২০১৭ সালেও সিআইডি (CID)-র তদন্তে রাজ্যে প্রায় ৫০০ জন ভুয়ো ডাক্তারের খোঁজ মিলেছিল। সেই সময় কলকাতার একাধিক নামীদামি বেসরকারি হাসপাতালেও এই ভুয়ো চিকিৎসকদের প্র্যাকটিস করার কথা সামনে এসেছিল। কিন্তু চিকিৎসক সংগঠনগুলোর আক্ষেপ, সেই ঘটনার পর এত বছর কেটে গেলেও খুব কম জনের বিরুদ্ধেই কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে আবারও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় থাবা বসিয়েছে এই প্রতারণা চক্র।

রাজনৈতিক তরজা ও বিরোধীদের আক্রমণ
এই ভুয়ো ডাক্তার ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতেও শুরু হয়েছে তুমুল তরজা। বিরোধীদের অভিযোগ, বর্তমান সরকারের আমলেই মেডিক্যাল কাউন্সিলে এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি প্রশ্রয় পাচ্ছে। চিকিৎসকদের একটা বড় অংশের অভিযোগ, ২০২২ সালে মেডিক্যাল কাউন্সিল নির্বাচনে রিগিং করে তৃণমূল প্রভাবিত চিকিৎসকরা ক্ষমতা দখল করেছেন এবং তাঁদের ছত্রচ্ছায়াতেই এই দুর্নীতি চলছে। তবে শাসকদলের দাবি, এই অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং প্রশাসন ইতিমধ্যেই এই র্যাকেট ধরতে কড়া পদক্ষেপ করতে শুরু করেছে।

সাধারণ মানুষের আতঙ্ক ও আগামী দিনের রূপরেখা
ডাক্তারদের বলা হয় ‘ভগবানের রূপ’, আর সেই ভরসাতেই সাধারণ মানুষ তাঁদের জীবন চিকিৎসকদের হাতে তুলে দেন। কিন্তু দিনের পর দিন এই ভুয়ো চিকিৎসকদের রমরমা সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এবং মফঃস্বল এলাকার মানুষ, যাঁরা অতটা সচেতন নন, তাঁরাই সবথেকে বেশি এই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। ইউটিউব দেখে অপারেশন করার মতো ভয়াবহ ঘটনাও সামনে এসেছে, যার জেরে প্রাণ গিয়েছে নিরীহ রোগীর।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র স্বাস্থ্য কমিশন বা পুলিশের পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়, এই সমস্যা মেটাতে প্রয়োজন একটি সেন্ট্রালাইজড এবং ডিজিটাল ভেরিফিকেশন সিস্টেম। যেখানে রোগীরা চাইলে অনলাইনেই তাঁদের চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে তাঁর সত্যতা যাচাই করতে পারবেন। এই ঘটনা রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর একটি বড় ফাঁকফোকর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। এখন দেখার, রাজ্য প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কমিশন মিলে এই বিশাল প্রতারণা চক্রের শিকড় কীভাবে উপড়ে ফেলে এবং সাধারণ মানুষের মনে ফের কীভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনে।



