Humayun Kabir: ‘আমরা প্রচার করব না, ভোটের দিন যা হবে হবে!’ রেজিনগর উপনির্বাচনের আগেই পুলিশের বিরুদ্ধে চরম হুঁশিয়ারি হুমায়ুনের
KOLKATA: Humayun Kabir বা রাজ্যের দাপুটে বিধায়ক এবং আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (AJUP)-এর প্রধান হুমায়ুন কবীর রেজিনগর উপনির্বাচনের ঠিক আগে রাজ্য রাজনীতিতে এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে চরম পক্ষপাতিত্ব এবং তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের ওপর অন্যায়ভাবে অত্যাচার চালানোর মারাত্মক অভিযোগ তুলে তিনি নির্বাচন কমিশনের সামনে এক চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। দলের শীর্ষ নেতাদের একের পর এক মেগা গ্রেপ্তারি এবং নিজের বিরুদ্ধে জারি হওয়া আইনি নোটিসের প্রতিবাদে হুমায়ুন কবীর স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর দল রেজিনগর উপনির্বাচনে আর কোনো প্রচার করবে না। সংবাদমাধ্যমের সামনে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ এবং হতাশ গলায় তিনি বলেন, “আমরা প্রচার করব না, ভোটের দিন যা হবে, হবে… রেজিনগরে আমাদের প্রবলভাবে ডিস্টার্ব করা হচ্ছে।” নির্বাচনের ঠিক মুখে দাঁড়িয়ে একজন হেভিওয়েট নেতার প্রচার থেকে সরে দাঁড়ানোর এই আকস্মিক ঘোষণা মুর্শিদাবাদ-সহ গোটা বাংলার রাজনৈতিক মহলে আক্ষরিক অর্থেই এক প্রবল ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছে।

চলতি বছরের বিধানসভা উপনির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) দলের সঙ্গে সমস্ত রকম রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে সম্পূর্ণ নতুন এক রাজনৈতিক দল ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’ গঠন করেছিলেন হুমায়ুন কবীর। মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে, বিশেষ করে রেজিনগর এবং নওদা এলাকায় তাঁর একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে। আসন্ন ৬ অক্টোবরের রেজিনগর উপনির্বাচনে তিনি তাঁর নিজের ছেলে গোলাম নবী আজাদ রবিনকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ময়দানে নামিয়েছেন। উপনির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই বাবা ও ছেলে মিলে রেজিনগরের মাঠে-ঘাটে জোরদার প্রচার শুরু করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। হুমায়ুন কবীরের অভিযোগ, রাজ্যের শাসকদলের নির্দেশে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন সম্পূর্ণ একপেশে আচরণ করছে। তাঁর দলের নেতা, কর্মী এবং প্রচারকদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে জেলে ঢোকানো হচ্ছে, যাতে তাঁরা রেজিনগরের মাটিতে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনের কাজ পরিচালনা করতে না পারেন। শাসকদল ভয় পেয়েই পুলিশের আড়ালে এই নোংরা রাজনৈতিক খেলা খেলছে বলে তোপ দেগেছেন তিনি।
হুমায়ুন কবীরের এই চরম ক্ষোভের নেপথ্যে রয়েছে গত কয়েকদিনের বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর পুলিশি পদক্ষেপ। জানা গিয়েছে, শনিবার রাত থেকে রবিবার ভোর পর্যন্ত মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশের এক বিশাল অভিযানে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির চারজন শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন দলের নওদা ব্লক সভাপতি এবং রেজিনগরের নির্দল প্রার্থী সাইফুল ইসলামও। পুলিশি অতিসক্রিয়তা এখানেই থেমে থাকেনি। একটি বিতর্কিত ভাইরাল অডিয়ো ক্লিপের সূত্র ধরে স্বয়ং হুমায়ুন কবীরের শক্তিপুরের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে নোটিস দিয়ে এসেছে বহরমপুর থানার পুলিশ। পুলিশের দাবি, ওই অডিয়ো ক্লিপে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানো এবং গ্যাং তৈরি করে অশান্তি পাকানোর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত রয়েছে, যেখানে কণ্ঠস্বরটি হুমায়ুনের বলেই অভিযোগ। যদিও হুমায়ুন কবীর এই সমস্ত অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক চক্রান্ত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, তাঁকে এবং তাঁর ছেলেকে ভোটের ময়দান থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই পুলিশকে ব্যবহার করে এই সমস্ত সাজানো মিথ্যা মামলার নাটক তৈরি করা হচ্ছে।

রেজিনগর উপনির্বাচনে হুমায়ুন কবীরের প্রচার থেকে সরে দাঁড়ানোর এই সিদ্ধান্ত সেখানকার নির্বাচনী সমীকরণকে এক সম্পূর্ণ নতুন এবং জটিল মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে যখন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী নিজের মনোনয়ন প্রত্যাহারের নাটকীয় সিদ্ধান্ত বদল করে দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের আশ্বাসে ফের একবার জোরকদমে প্রচার শুরু করেছেন, তখন হুমায়ুনের এই পিঠটান দেওয়া শাসকদলের কাছে কিছুটা হলেও স্বস্তির খবর। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, হুমায়ুন কবীর অত্যন্ত পোড়খাওয়া এবং চতুর রাজনীতিবিদ। প্রচার বন্ধ রাখার এই সিদ্ধান্তটি তাঁর একটি মাস্টারস্ট্রোকও হতে পারে। তিনি হয়তো প্রকাশ্যে জনসভা বা র্যালি বন্ধ রেখে সাধারণ মানুষের সিমপ্যাথি বা সহানুভূতি আদায়ের এক সূক্ষ্ম কৌশল গ্রহণ করেছেন। “ভোটের দিন যা হবে, হবে” – তাঁর এই বার্তার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি। অর্থাৎ, ময়দানে প্রচার না করলেও রেজিনগরের মাটিতে তাঁর যে নিজস্ব নীরব ভোটব্যাঙ্ক রয়েছে, ব্যালট বাক্সে তারা শাসকদলকে কড়া জবাব দেবে বলেই মনে করছেন তিনি।
মুর্শিদাবাদের রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্র এখন আক্ষরিক অর্থেই এক রাজনৈতিক বারুদস্তূপে পরিণত হয়েছে। হুমায়ুন কবীর ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের কাছে কড়া ভাষায় অভিযোগ জানিয়ে দাবি করেছেন যে, রেজিনগর, শক্তিপুর, বেলডাঙা এবং হরিহরপাড়া থানার আধিকারিকদের অবিলম্বে বদলি না করলে কোনোভাবেই এই এলাকায় অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণ সম্ভব নয়। তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, পুলিশ যদি শাসকদলের ক্যাডার হিসেবে কাজ করা বন্ধ না করে, তবে তাঁরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এর শেষ দেখে ছাড়বেন। আগামী ৬ অক্টোবর রেজিনগরের ভাগ্য নির্ধারণ হতে চলেছে। এখন এটাই দেখার যে, নির্বাচন কমিশন হুমায়ুনের এই গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ প্রশাসনের ওপর কোনো কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করে কি না। আর অন্যদিকে, শেষ মুহূর্তে হুমায়ুন কবীর কি ফের তাঁর ছেলের সমর্থনে ময়দানে নামবেন, নাকি নীরব থেকেই ব্যালট বাক্সে শাসকদলকে বড়সড় কোনো মেগা চমক দেবেন? বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস মনে রাখবে যে একটি উপনির্বাচনকে ঘিরে এমন রুদ্ধশ্বাস নাটক এবং পুলিশের সঙ্গে প্রার্থীর এমন সরাসরি সংঘাত খুব কমই দেখা গিয়েছে।




