Rabiul Alam Chowdhury: রেজিনগরে মেগা ইউ-টার্ন! ময়দান ছাড়ছেন না মমতা শিবিরের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী, লড়াইয়ের ঘোষণায় সরগরম রাজনীতি
KOLKATA: Rabiul Alam Chowdhury বা রবিউল আলম চৌধুরী রেজিনগরের নির্বাচনী ময়দানে এক নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে বঙ্গ রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে মুর্শিদাবাদের রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবিরের প্রার্থী তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে এক চূড়ান্ত নাটকীয় ইউ-টার্ন নিলেন। আগের দিন মনোনয়ন প্রত্যাহারের জল্পনা উসকে দিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে যে প্রবল ডামাডোলের সৃষ্টি করেছিলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সেই অবস্থান থেকে সরে এলেন তিনি। সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, তিনি কোনোভাবেই ময়দান ছেড়ে পালাচ্ছেন না এবং উপনির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (CM Suvendu Adhikari) দোর্দণ্ডপ্রতাপ বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে তিনি শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করবেন। তাঁর এই আকস্মিক ডিগবাজি বা অবস্থান বদলের ফলে রেজিনগরের নির্বাচনী সমীকরণ ফের এক নতুন মাত্রায় গিয়ে পৌঁছাল। নন্দীগ্রামে সঞ্চিতা প্রধান দের পলায়নের পর যখন গোটা রাজ্যে মমতা শিবিরের চরম পতন নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছিল, ঠিক তখনই রবিউলের এই প্রত্যাবর্তন দলের নিচুতলার কর্মীদের কিছুটা হলেও অক্সিজেনের জোগান দিয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরেই রেজিনগর কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরীর রাজনৈতিক গতিবিধি নিয়ে ব্যাপক ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক মহলে তীব্র গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল যে, নন্দীগ্রামের তৃণমূল প্রার্থীর মতো তিনিও হয়তো বিজেপির মনস্তাত্ত্বিক চাপ বা মুখ্যমন্ত্রীর কোনো গোপন বার্তার জেরে পিঠটান দিতে চলেছেন। তাঁর জনসংযোগ বন্ধ থাকা এবং প্রচার থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়াই এই জল্পনাকে আরও জোরালো করে তুলেছিল। কিন্তু সমস্ত গুঞ্জনে জল ঢেলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর মনোনয়ন প্রত্যাহারের খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বিরোধীদের সাজানো চক্রান্ত। তিনি বলেন, সাময়িকভাবে তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে কিছু কৌশলগত আলোচনা করার জন্যই কিছুটা সময় নিয়েছিলেন। কোনোভাবেই তিনি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না। রবিউল দাবি করেছেন যে, বিজেপি এবং বিরোধী শিবির ইচ্ছা করেই তাঁর নামে ভুয়ো খবর ছড়িয়ে তৃণমূল কর্মীদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার এক নোংরা খেলা খেলছিল, যার মোক্ষম জবাব তিনি ভোটের ময়দানেই দেবেন বলে বদ্ধপরিকর।

রবিউল আলম চৌধুরীর এই প্রত্যাবর্তনের নেপথ্যে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্বের যে কড়া ভূমিকা রয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নন্দীগ্রামে সঞ্চিতা প্রধান দের নাটকীয় পলায়নের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল আর কোনোভাবেই রেজিনগরের মাটি বিনা যুদ্ধে ছাড়তে রাজি ছিল না। দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড এবং শীর্ষ নেতারা দ্রুত ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামেন এবং রবিউলের সঙ্গে দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। তাঁকে বোঝানো হয় যে, এই মুহূর্তে তিনি যদি ময়দান থেকে সরে দাঁড়ান, তবে রাজ্যজুড়ে দলের অস্তিত্ব এক বিশাল বড় সংকটের মুখে পড়বে এবং সাধারণ মানুষের কাছে তৃণমূলের ভাবমূর্তি চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে। শীর্ষ নেতৃত্বের সেই কড়া বার্তা এবং সমর্থনের আশ্বাস পাওয়ার পরেই রবিউল নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান এবং লড়াইয়ের ময়দানে টিকে থাকার এই মেগা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। দলের তরফে তাঁকে সমস্ত রকম সাংগঠনিক ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে দলের আদি নাম এবং ‘জোড়াফুল’ প্রতীক সাময়িকভাবে ফ্রিজ হয়ে যাওয়ার পর রবিউল আলম চৌধুরীকে এবার সম্পূর্ণ নতুন ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক নিয়ে ময়দানে লড়তে হচ্ছে। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে এই আনকোরা নতুন প্রতীক নিয়ে প্রচার করাটা তাঁর কাছে এমনিতেই এক বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ। তার ওপর আবার এই মনোনয়ন প্রত্যাহার ঘিরে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি সেই চ্যালেঞ্জকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে রবিউল আলম চৌধুরী আত্মবিশ্বাসী যে, মুর্শিদাবাদের মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদর্শ এবং রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলির কথা মাথায় রেখেই তাঁকে ভোট দেবেন। তিনি ইতিমধ্যেই তাঁর কর্মী-সমর্থকদের নির্দেশ দিয়েছেন, এই সাময়িক বিভ্রান্তির কারণে যে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে এখন দিনরাত এক করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীকের হয়ে প্রচার চালাতে হবে। তাঁর দাবি, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পুলিশ বা প্রশাসন যতই ভয় দেখাক না কেন, রেজিনগরের মাটি তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি এবং সেখানে বিরোধীরা কোনোভাবেই দাঁত ফোটাতে পারবে না।

আগামী ৬ অক্টোবর রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। রবিউল আলম চৌধুরীর এই ইউ-টার্নের ফলে রেজিনগরের লড়াই এখন আক্ষরিক অর্থেই এক ত্রিমুখী মহারণে পরিণত হয়েছে। একদিকে যেমন রয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর আশীর্বাদধন্য আগ্রাসী বিজেপি প্রার্থী, অন্যদিকে রয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’-এর ‘খাম’ প্রতীকের প্রার্থী। আর এই দুই শক্তিশালী শিবিরের বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্মান রক্ষার কঠিন লড়াইয়ে রয়েছেন রবিউল। নন্দীগ্রামে প্রার্থীশূন্য হয়ে যাওয়ার পর তৃণমূল সুপ্রিমোর সম্পূর্ণ ফোকাস এখন এই রেজিনগর কেন্দ্রের ওপরই নিবদ্ধ। রবিউল কি পারবেন নিজের এই অবস্থান বদলের পর সাধারণ ভোটারদের মনে নতুন করে আস্থা ফেরাতে? নতুন প্রতীক কি পারবে সাধারণ মানুষের পুরনো আবেগ ফিরিয়ে আনতে? নাকি বিরোধীরা তাঁর এই দোদুল্যমান অবস্থাকে দুর্বলতা হিসেবে প্রচার করে ব্যালট বাক্সে ফায়দা তুলবে? উপনির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, রবিউল আলম চৌধুরীর এই নাটকীয় অবস্থান বদল বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে এক চরম টানটান উত্তেজনার অধ্যায় হিসেবেই লিপিবদ্ধ থাকবে।




