Pranati Nayak: এশিয়ান গেমসে ইতিহাস বাংলার মেয়ের! জিমন্যাস্টিক্সের ভল্ট ফাইনালে প্রণতি নায়েক
KOLKATA: Pranati Nayak বা পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলের মাটির অপ্রতিরোধ্য কন্যা প্রণতি নায়েক ২০২৬ এশিয়ান গেমসের মঞ্চে আবারও ভারতের নাম উজ্জ্বল করে এক অনন্য ঐতিহাসিক নজির সৃষ্টি করলেন। এশিয়ান গেমসে ভারতের একমাত্র জিমন্যাস্ট হিসেবে অংশ নিয়ে মহিলাদের ভল্ট ইভেন্টের যোগ্যতা পর্বে অসাধারণ পারফর্ম করে সরাসরি ফাইনালে নিজের জায়গা নিশ্চিত করেছেন তিনি। ২২ সেপ্টেম্বরের যোগ্যতা পর্বে এশিয়ার বিভিন্ন শক্তিশালী দেশের মোট ১৯ জন আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ে সপ্তম স্থান অধিকার করে শেষ আটের ফাইনাল পর্বে পৌঁছে গিয়েছেন প্রণতি। আন্তর্জাতিক মঞ্চে যেখানে ভারতীয় জিমন্যাস্টিক্সের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত, সেখানে প্রণতির এই অবিস্মরণীয় সাফল্য আবারও প্রমাণ করল যে অদম্য জেদ আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করা সম্ভব। এই ঐতিহাসিক সাফল্যের খবরে গোটা দেশ তো বটেই, বিশেষ করে বাংলার ক্রীড়ামহল অত্যন্ত গর্বিত এবং উচ্ছ্বসিত।

মহিলাদের ভল্ট ইভেন্টের যোগ্যতা পর্বে প্রণতি নায়েক মোট দু’টি ভল্ট অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। প্রথম ভল্টটিতে তিনি ৪.৪ ডিফিকাল্টি স্কোর এবং ৮.৬০০ এক্সিকিউশন স্কোর পেয়ে দুর্দান্তভাবে ১৩.০০০ পয়েন্ট অর্জন করেন। এরপর দ্বিতীয় ভল্টে ৪.০ ডিফিকাল্টি এবং ৮.৪৩৩ এক্সিকিউশন স্কোরের সুবাদে তাঁর ঝুলিতে আসে ১২.৪৩৩ পয়েন্ট। নিয়ম অনুযায়ী দু’টি ভল্টের গড় পয়েন্টের নিরিখে প্রণতির চূড়ান্ত যোগ্যতা-স্কোর দাঁড়ায় ১২.৯১৬। এই স্কোরের জোরেই তিনি বিশ্বের তাবড় প্রতিযোগীদের টেক্কা দিয়ে প্রথম আটজনের মধ্যে ঢুকে সরাসরি মেডেল রাউন্ডে প্রবেশ করেন। এই পর্বে দক্ষিণ কোরিয়ার সিওজং ইয়ো ১৪.৪৬৬ স্কোর নিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এছাড়া উত্তর কোরিয়ার আন চ্যাং-ওক ১৩.৯০০ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় এবং চিনের দু সিউ ১৩.৪৩৩ স্কোর নিয়ে তৃতীয় স্থান দখল করেন। এশিয়ার এই সমস্ত হেভিওয়েট জিমন্যাস্টদের ভিড়ে সপ্তম স্থানে শেষ করে প্রণতির পদকের লড়াইয়ে জায়গা করে নেওয়া ভারতীয় ক্রীড়ার ইতিহাসে এক অত্যন্ত উজ্জ্বল মুহূর্ত।
জঙ্গলমহলের পিংলা থেকে উঠে আসা প্রণতির এই সাফল্য কিন্তু কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে চলা নিঃশব্দ লড়াই এবং ত্যাগের ফল। সাধারণ এক গ্রামীণ পরিবার থেকে উঠে এসে কলকাতার সাই (SAI) কমপ্লেক্সে কঠোর অনুশীলন এবং সুযোগ-সুবিধার অভাবের সঙ্গে লড়াই করে তিনি নিজেকে আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এর আগে টোকিও অলিম্পিক্সে ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার মতো অত্যন্ত দুর্লভ সম্মান অর্জন করেছিলেন প্রণতি। শুধু তাই নয়, এশিয়ান জিমন্যাস্টিক্স চ্যাম্পিয়নশিপের মঞ্চে তাঁর ঝুলিতে রয়েছে তিনটি ঐতিহাসিক ব্রোঞ্জ পদক। এছাড়া চলতি ২০২৬ সালের তাশখন্দ এফআইজি ওয়ার্ল্ড চ্যালেঞ্জ কাপে মহিলাদের ভল্ট বিভাগে রুপোর পদক জয় করে তিনি আন্তর্জাতিক জিমন্যাস্টিক্সের সার্কিটে নতুন করে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলেন। সেই সমস্ত বহু মূল্যবান আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাই এবার এশিয়ান গেমসের এই মহা-মঞ্চে চরম স্নায়ুর চাপ সামলাতে তাঁকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে।

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে চলেছে মহিলাদের ভল্ট ইভেন্টের মেগা ফাইনাল। তবে আন্তর্জাতিক জিমন্যাস্টিক্সের নিয়ম অনুযায়ী, যোগ্যতা পর্বের অর্জিত কোনো পয়েন্ট বা স্কোর ফাইনালে বহন করা হয় না। অর্থাৎ ফাইনালের দিন আটজন চূড়ান্ত প্রতিযোগীর সবাইকেই সম্পূর্ণ নতুন এবং সমান জায়গা থেকে লড়াই শুরু করতে হবে। ফলে যোগ্যতা পর্বে সপ্তম হলেও ফাইনালে দুটি নিখুঁত ল্যান্ডিং ও যথাযথ এক্সিকিউশন করতে পারলে প্রণতির সামনে পদক জয়ের এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর আগে ভারতের হয়ে দীপা কর্মকার আন্তর্জাতিক মঞ্চে পদক জিতে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন। দীপার পর প্রণতিই একমাত্র ভারতীয় যিনি আন্তর্জাতিক জিমন্যাস্টিক্সে নিয়মিতভাবে দেশকে পদক এনে দিচ্ছেন। তাই ২৪ সেপ্টেম্বরের এই মেগা ফাইনালকে ঘিরে ভারতীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের প্রত্যাশা এখন আকাশছোঁয়া।
এবারের এশিয়ান গেমসে ভারতীয় জিমন্যাস্টিক্স দলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে সমস্ত প্রত্যাশার গুরুভার নিজের কাঁধে একাই বহন করছেন প্রণতি নায়েক। ভারতের মতো দেশে যেখানে জিমন্যাস্টিক্সের মতো খেলায় পরিকাঠামোর যথেষ্ট অভাব রয়েছে, সেখানে এই বঙ্গতনয়ার ফাইনালের টিকিট অর্জন করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাজার হাজার তরুণ অ্যাথলিটের কাছে এক বিশাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। জীবনের বহু কঠিন ওঠাপড়া, চোট-আঘাত এবং আর্থিক অনিশ্চয়তাকে পিছনে ফেলে প্রণতি যেভাবে নিজেকে লড়াইয়ের ময়দানে টিকিয়ে রেখেছেন, তার কোনো তুলনাই হয় না। এখন দেখার বিষয়, আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের ঐতিহাসিক ফাইনালে প্রণতি তাঁর নিখুঁত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে এশিয়ান গেমসের মঞ্চ থেকে পদক গলায় ঝুলিয়ে ফিরতে পারেন কি না। কোটি কোটি দেশবাসী এখন তাঁর ঐতিহাসিক সোনালী বা রুপোলী সাফল্যের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।




