Election Commission SIR Notice: সমাধান নয়, বিজ্ঞপ্তি নিজেই এক বড় প্রশ্ন! নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকা ঘিরে আজ দেশজুড়ে সংশয়
Election Commission SIR Notice: আজ পয়লা অক্টোবর। গত ছাব্বিশে সেপ্টেম্বর জাতীয় নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে যে বিশেষ প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল, তা নিয়ে আজও দেশজুড়ে চরম ধোঁয়াশা এবং বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসনিক মহলে এবং রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কাছে এই নির্দেশিকাটি সমাধানের কোনো রাস্তা তো দেখাতে পারেইনি, বরং এটি নিজেই এখন এক বিরাট বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথম দর্শনে মনে হয়েছিল যে, কমিশন হয়তো নিজেদের ত্রুটি শুধরে নিয়ে একটি স্বচ্ছ এবং উন্নত প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশির মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বরা যখন এই বিজ্ঞপ্তির গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন, তখন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, এই তথাকথিত উত্তর আসলে একাধিক নতুন এবং অস্বস্তিকর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আজ দেশবাসীর মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যে, এগুলো কি সত্যিই নতুন কোনো সংস্কার, নাকি এতদিন ধরে যে নিয়মগুলো এমনিতেই মেনে চলার কথা ছিল, সেগুলোরই চূড়ান্ত গাফিলতি ঢাকার এক মরিয়া চেষ্টা?

কমিশনের ওই বহুচর্চিত বিজ্ঞপ্তিতে একাধিক প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছে। যেমন, এখন থেকে বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও-রা সরাসরি ভোটারদের বাড়িতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন এবং ডিজিটাল মাধ্যমে তা আপলোড করবেন। গৃহহীন এবং অস্থায়ী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ শিবিরের ব্যবস্থা করা হবে। শুনতে খুব ভালো লাগলেও বাস্তবের মাটিতে এর কার্যকারিতা নিয়ে আজ বড়সড় প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। কারণ, ভোটারদের মূল সমস্যা কখনোই নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরের দূরত্ব ছিল না, মূল বাধাটি হলো প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাব। যে ভোটারের কাছে সঠিক প্রমাণপত্র নেই, আধিকারিক তাঁর দরজায় গিয়ে দাঁড়ালেও তিনি তা দেখাতে পারবেন না। অর্থাৎ, নথিপত্র জোগাড় করার বিশাল বোঝাটি কেবল দপ্তর থেকে সাধারণ মানুষের বাড়ির দোরগোড়ায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে মাত্র। অন্যদিকে, তথ্যের অসঙ্গতি নিয়ে দিল্লি-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেভাবে যান্ত্রিক উপায়ে হাজার হাজার মানুষকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে, তা নিয়ে খোদ দেশের শীর্ষ আদালতও কমিশনের কাছে জবাব তলব করেছে।

এই সমগ্র বিতর্কের মধ্যে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে গুরুতর এবং প্রাসঙ্গিক বিষয়টি হলো নির্বাচনী আধিকারিকের আইনি অধিকার এবং প্রযুক্তির হস্তক্ষেপের চরম সংঘাত। জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের তেরো বি ধারা অনুযায়ী, ভোটার তালিকা তৈরি এবং তা সংশোধনের সম্পূর্ণ আইনি এবং বিধিবদ্ধ অধিকার রয়েছে একজন ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা ইআরও-র হাতে। কিন্তু গোয়ার একটি সাম্প্রতিক ঘটনা এই প্রশাসনিক পরিকাঠামোর কঙ্কালসার চেহারাটা আজ সামনে এনে দিয়েছে। সেখানে সাতানব্বই জন ভোটারের তথ্য দীর্ঘ যাচাই করার পর স্থানীয় আধিকারিকরা তাঁদের নাম তালিকায় যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রিত বিশেষ সফটওয়্যার সেই আধিকারিকদের আইনি নির্দেশ মানতে অস্বীকার করে। আধিকারিকরা সাত দিনে আটবার অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও সেই সাতানব্বই জনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় ওঠেনি। প্রশ্ন উঠছে, প্রযুক্তি কি আইনের ঊর্ধ্বে চলে যেতে পারে? যে ভোটারদের যোগ্যতা একজন সরকারি আধিকারিক প্রমাণ করেছেন, একটি সফটওয়্যারের জেদের কাছে কেন তাঁদের হার মানতে হবে?

আরও পড়ুন: INDIA Alliance Meeting: ইভিএম নয় ব্যালট চাই! দিল্লিতে বড় আন্দোলনের ডাক ‘ইন্ডিয়া’ জোটের
নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করার জন্য নির্ধারিত ফর্ম ছয় নিয়েও নির্বাচন কমিশনের অন্দরে এক অভূতপূর্ব দ্বন্দ্ব আজ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। গত ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই নির্দিষ্ট ফর্মটি অত্যন্ত সফলভাবে এবং নির্বিঘ্নে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন দাবি করেছিল যে মূল ফর্মটিতে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। কিন্তু অভ্যন্তরীণ নথিপত্র থেকে জানা যাচ্ছে যে, অনলাইনে ফর্ম ছয় পূরণের সময় বাবা-মায়ের দুই হাজার তিন সালের ভোটার তালিকার তথ্য সংক্রান্ত একটি বাধ্যতামূলক প্রশ্ন সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কমিশনের বাকি দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী গত দশ মাসে অন্তত চোদ্দো বার এই ধরনের একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁরা ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, নতুন নাম যুক্ত করা এবং তথ্যভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু তাঁদের সেই সমস্ত আপত্তি কেন এতদিন শোনা হয়নি, কমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে তার কোনো উত্তর নেই।

এই সমগ্র প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি আজ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং উদ্বেগজনক। রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে মোট আটত্রিশ লক্ষ একত্রিশ হাজার আপিল জমা পড়েছে। এর মধ্যে বাইশ লক্ষ একুশ হাজার আপিল করেছেন সেই সমস্ত ভোটার, যাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ষোলো লক্ষ দশ হাজার আপিল জমা পড়েছে অন্যদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবিতে। আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই বিপুল সংখ্যক আপিল কে বা কারা দায়ের করেছেন এবং কার নির্দেশে করা হয়েছে? নির্বাচন কমিশনের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশা অনেক বেশি। প্রযুক্তি এবং সফটওয়্যারকে সবসময় দেশের আইনের সেবায় কাজে লাগাতে হবে, যন্ত্র কখনোই মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার হাতিয়ার হতে পারে না। ভবিষ্যতের জন্য ভালো পদ্ধতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে অতীতের ভুলগুলো চাপা দেওয়া যায় না। সাধারণ ভোটারদের অধিকার রক্ষায় কমিশন আগামী দিনে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, এখন সেটাই দেখার।




