INDIA Alliance Meeting: ইভিএম নয় ব্যালট চাই! দিল্লিতে বড় আন্দোলনের ডাক ‘ইন্ডিয়া’ জোটের
INDIA Alliance Meeting: দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে এবার দেশজোড়া ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক নজিরবিহীন বিতর্কের আবহে নিজেদের সংহতি প্রদর্শন করতে বুধবার রাজধানী দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে এক ঐতিহাসিক বৈঠকে মিলিত হন ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শীর্ষ নেতৃত্ব। দীর্ঘ তিন ঘণ্টাব্যাপী চলা এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ভোট প্রক্রিয়ায় কারচুপি, এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে গণহারে নাম বাদ দেওয়া এবং নির্বাচন কমিশনের একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিএম, আরজেডি, পিডিপি এবং ন্যাশনাল কনফারেন্স-সহ মোট উনিশটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই বৈঠকে সরাসরি অংশ নেন। বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অবিলম্বে ইস্তফার দাবি তোলার পাশাপাশি, ইভিএম বর্জন করে ব্যালট পেপারে ফিরে যাওয়ার দাবিতে একগুচ্ছ ধারাবাহিক আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিরোধী শিবির।

কনস্টিটিউশন ক্লাবের এই মেগা বৈঠকে বিরোধী নেতৃত্বের বসার বিন্যাস এবং উপস্থিতি ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর দুই পাশে আসন গ্রহণ করেছিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি। অন্যদিকে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর পাশেই ছিলেন ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লা। এছাড়া সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য এম এ বেবি, সিপিআইএমএল-এর দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব এবং এনসিপির সুপ্রিয়া সুলে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন। তৃণমূলের পক্ষ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দোলা সেনও ছিলেন বৈঠকে। মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে এবং ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন ভার্চুয়ালি এই বৈঠকে যুক্ত হন। উত্তরপ্রদেশের দশটি আসনের রাজ্যসভা ভোটের কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে সমাজবাদী পার্টি প্রধান অখিলেশ যাদব নিজে না এলেও তাঁর দুই সাংসদ হরেন্দ্র মালিক ও মৌলানা মহিবুল্লাহ নদভিকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। তবে এই বৈঠকে তামিলনাড়ুর শাসকদল ডিএমকে এবং দিল্লির শাসকদল আপ-এর কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।

আরও পড়ুনঃ Anubrata Mondal: পার্টি অফিসে আক্রান্ত অনুব্রত! কলার ধরে পনেরো বছরের হিসেব চাইল আগন্তুকরা।
সুদীর্ঘ আলাপ-আলোচনা শেষে বিরোধী নেতৃত্বের তরফ থেকে নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে মূল চার দফা দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা হয়। প্রথম দাবিতে বলা হয়েছে, আগামী দিনে যে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে গেলে বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার পূর্ববর্তী ভোটার তালিকা অনুযায়ী ভোট করাতে হবে। দ্বিতীয়ত, উপযুক্ত কারণ ও নোটিস ছাড়া কোনো বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে একতরফাভাবে বাদ দেওয়া চলবে না এবং তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, তথ্যের অভাব, নথিপত্রের বিভ্রান্তি বা প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে যে সমস্ত বৈধ নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে ছাঁটাই হয়েছে, তাঁদের উপযুক্ত আইনি রক্ষাকবচ দিয়ে তালিকায় ফেরাতে হবে। চতুর্থ এবং সবথেকে জোরালো দাবি হিসেবে উঠে এসেছে নির্বাচন থেকে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে জনগণের রায়কে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা রুখতেই ব্যালটে ফেরা জরুরি।
![]()
বৈঠক শেষে কংগ্রেস সভাপতি তথা রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে আগামী দিনের দেশজোড়া আন্দোলনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করেন। তিনি জানান, দেশের আমজনতা, ছাত্র-যুব এবং নাগরিক সংগঠনগুলিকে পাশে নিয়ে আগামী দুই থেকে আটই অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে জেলা পর্যায়ে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ পদযাত্রা এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে। এরপর আগামী ছয়ই অক্টোবর সমস্ত বিরোধী সাংসদ একসঙ্গে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তর নির্বাচন সদন অভিমুখে প্রতিবাদী মিছিল করবেন। দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে মহামান্য রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চাওয়া হবে। খাড়গে আরও ঘোষণা করেন যে, অক্টোবর ও নভেম্বর মাস জুড়ে সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঁচটি বড় জনসভা করা হবে এবং আগামী বছরের একলা জানুয়ারি খোদ দিল্লিতে একটি সুবিশাল সমাবেশের আয়োজন করা হবে। এছাড়াও সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন নির্বাচনী কারচুপি সংক্রান্ত মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আবেদন জানানো হবে।

সাংবাদিক সম্মেলনে খাড়গের পর বক্তব্য রাখতে গিয়ে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে তাঁর পদত্যাগের দাবি তোলেন এবং পদত্যাগ না করলে আন্দোলন আরও তীব্র করার হুঁশিয়ারি দেন। রাহুল গান্ধীও কড়া ভাষায় জানান যে, কোনো একক ব্যক্তির চেয়ে দেশের গণতন্ত্র অনেক বড় এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নষ্ট করার জন্য দায়ীদের শাস্তি সুনিশ্চিত করা হবে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ দুই কমিশনারের আপত্তির প্রসঙ্গ টেনে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অন্যদিকে, এই বৈঠকের সমান্তরালেই অতীতে বিরোধী জোটের ঐক্য এবং নীতীশ কুমারের দলবদল নিয়ে কংগ্রেসের অন্দরে দিগ্বিজয় সিংহ বনাম সোনিয়া গান্ধীর মতবিরোধের খবর প্রকাশিত হলেও, সাংবাদিক বৈঠকের মঞ্চে বিরোধীরা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, নির্বাচনী ব্যবস্থার এই সংকটে তাঁরা সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে লড়াই চালিয়ে যাবেন।




