Adhir Chowdhury invites Mamata Banerjee: ‘লোটা কম্বল সব নিয়ে কংগ্রেসে চলে আসুন’, ইন্ডি জোটের বৈঠকের পরই মমতাকে অধীরের আমন্ত্রণ!
Adhir Chowdhury invites Mamata Banerjee: আগামী ছয় অক্টোবর রাজ্যের দু’টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা কেন্দ্র—রেজিনগর এবং নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। আর এই হাইভোল্টেজ নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে রাজ্য রাজনীতিতে এক অভাবনীয় এবং চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক সমীকরণ প্রকাশ্যে এল। একসময়ের কট্টর তৃণমূল বিরোধী নেতা হিসেবে পরিচিত প্রদেশ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী এবার সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর নিজের দল কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার জন্য প্রকাশ্য আমন্ত্রণ জানালেন। ইন্ডিয়া জোটের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পরই অধীর চৌধুরীর এই মন্তব্য জাতীয় এবং রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তাঁর প্রস্তাব, তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে বর্তমানে যে ক’জন বিধায়ক এবং সাংসদ অবশিষ্ট রয়েছেন, তাঁদের সকলকেই সঙ্গে নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেন কংগ্রেসের বিশাল ছত্রছায়ায় চলে আসেন। তবে এই আমন্ত্রণের পাশাপাশি তিনি একটি বিশেষ এবং তাৎপর্যপূর্ণ শর্তও জুড়ে দিয়েছেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিস্তর কাটাছেঁড়া চলছে। একদা একে অপরের প্রবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আজ কীভাবে এক ছাতার তলায় আসার কথা বলছেন, তা দেখে অনেকেই বিস্মিত।

সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে বলেন যে, তৃণমূল কংগ্রেসের যা কিছু অবশিষ্ট রয়েছে, অর্থাৎ রাজ্যসভা এবং লোকসভার সাংসদ থেকে শুরু করে বিধানসভার বিধায়ক—সবাইকে নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উচিত কংগ্রেসে শামিল হওয়া এবং বাংলা থেকে নেতৃত্ব দেওয়া। তিনি আরও বলেন যে, কংগ্রেস হলো একটি বিশাল বটগাছের মতো। যেহেতু তৃণমূল নেত্রী জাতীয় স্তরে ইতিমধ্যেই সেই বটগাছের তলায় আশ্রয় গ্রহণ করেছেন, তাই রাজ্যে আলাদা করে দল টিকিয়ে রাখার কোনো যৌক্তিকতা তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। তবে এর সঙ্গে তিনি অত্যন্ত শ্লেষের সুরে যোগ করেন যে, নেত্রী যেন তাঁর দলের সমস্ত ‘ব্যাগজ’ এবং ‘ঝঞ্ঝাট’ অর্থাৎ দুর্নীতির বোঝা বা বিতর্কিত নেতাদের বাদ দিয়ে কেবল স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতাদের নিয়ে কংগ্রেসে আসেন। অধীরের কথায়, “লোটা কম্বল সব নিয়ে কংগ্রেসে চলে আসুন।” তাঁর এই মন্তব্যটি যে যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ এবং রাজনৈতিক কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত সুচিন্তিত, তা মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

অধীর চৌধুরীর এই প্রকাশ্য আমন্ত্রণের পর স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূল কংগ্রেস শিবিরের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য মুখিয়ে ছিল রাজনৈতিক মহল। বৃহস্পতিবার দেশের রাজধানী দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে একটি সাংবাদিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে তাঁকে অধীর চৌধুরীর এই বিশেষ প্রস্তাব প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে দাঁড়িয়ে তিনি রাজ্যের কোনো আঞ্চলিক বিষয় বা আঞ্চলিক স্তরের নেতাদের মন্তব্য নিয়ে কোনো রকম কথা বলবেন কমলা। তবে নেত্রী মুখ না খুললেও দলের হয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ। তিনি অধীর চৌধুরীকে একহাত নিয়ে বলেন যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বদা সাধারণ মানুষের স্বার্থে রাজনীতি করেন এবং তাঁর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। কুণাল ঘোষের দাবি, যেখানে সোনিয়া গান্ধী এবং রাহুল গান্ধী স্বয়ং তৃণমূল নেত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন, সেখানে অন্য কারও এধরনের মন্তব্য করার পেছনে কোনো গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
![]()
অধীর চৌধুরীর এই আমন্ত্রণের পেছনে রাজ্যের বর্তমান এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংকটও কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে। বঙ্গ রাজনীতির গত আঠাশ বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এই প্রথমবার এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে চলেছে বাংলার একসময়ের দাপুটে শাসকদল। নির্বাচন কমিশনের এক কঠোর নির্দেশের জেরে ঐতিহ্যবাহী ‘জোড়াফুল’ প্রতীক এবং ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নামটির ব্যবহার আপাতত সম্পূর্ণভাবে স্থগিত বা ‘ফ্রিজ’ করা হয়েছে। কমিশনের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ফলে আসন্ন উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে বাধ্য হয়ে ‘কালীঘাট তৃণমূল’ নাম নিয়ে লড়াই করতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, জোড়াফুলের বদলে তাঁদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক। দলের নাম এবং পরিচিত প্রতীক হারানোর এই চরম সংকটজনক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে অধীর চৌধুরীর কংগ্রেসে যোগদানের এই প্রস্তাব রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই আইনি এবং প্রশাসনিক ধাক্কা সামলে দল কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

আরও পড়ুনঃ Annapurna Yojana Camp: ফের অন্নপূর্ণা যোজনায় আবেদনের সুযোগ! কাল থেকে রাজ্যজুড়ে শুরু জনকল্যাণ শিবিরম
এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব ইতিমধ্যেই আসন্ন উপনির্বাচনের ময়দানে পড়তে শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশনের এই কড়া নির্দেশিকা জারি হওয়ার পরপরই হাইভোল্টেজ নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে এক নাটকীয় পটপরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। সেখানে ‘কালীঘাট তৃণমূল’ শিবিরের প্রার্থী হিসেবে যাঁকে দাঁড় করানো হয়েছিল, সেই সঞ্চিতা প্রধান দে আকস্মিকভাবে নিজের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এর চেয়েও বড় রাজনৈতিক চমক হলো, নন্দীগ্রামে নিজেদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল সেখানে সরাসরি কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন করার বার্তা দিয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করছে যে, রাজ্য রাজনীতিতে তৃণমূল ও কংগ্রেসের মধ্যে সমীকরণ অত্যন্ত দ্রুত বদলাচ্ছে। একদিকে কংগ্রেস প্রার্থীর প্রতি তৃণমূলের নিঃশর্ত সমর্থন, আর অন্যদিকে তৃণমূলকে কংগ্রেসে মিশে যাওয়ার জন্য অধীরের প্রকাশ্য আহ্বান—সব মিলিয়ে আগামী ছয় অক্টোবরের উপনির্বাচনের আগে বাংলার রাজনৈতিক ময়দান এক টানটান উত্তেজনার সাক্ষী থাকতে চলেছে। উপনির্বাচনের ফলাফলই হয়তো নির্ধারণ করে দেবে এই নতুন সমীকরণের ভবিষ্যৎ।



