Neelakanti Patekar IIT Actress: নাটক থেকে জাতীয় পুরস্কার জয়, নানা পাটেকরের স্ত্রী নীলকান্তীর অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা
Mumbai: ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র তথা কিংবদন্তি অভিনেতা নানা পাটেকরের প্রয়াণের পর থেকেই চলচ্চিত্রপ্রেমীদের নজর এখন তাঁর বর্ণময় পরিবারের দিকে। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা পাটেকর বড় পর্দা কাঁপিয়ে গেলেও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং স্ত্রী নীলকান্তী পাটেকরের অবদান সবসময়ই এক আলাদা গুরুত্ব বহন করে এসেছে। নানা পাটেকরের স্ত্রী নীলকান্তী পাটেকর নিজে একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান এবং জাতীয় স্তরে স্বীকৃত অভিনেত্রী। মারাঠি থিয়েটার এবং চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় তিনি নিজের মেধা ও দক্ষতার জোরে এক অত্যন্ত শক্তপোক্ত ও স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর এই সাফল্যের পথটা নেহাত সহজ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় তুখোড় মেধার পরিচয় দেওয়া নীলকান্তী জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে এসে প্রথাগত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নিরাপদ রাস্তা ছেড়ে নিজের মনের টানে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত অভিনয় জগতকে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত এবং জীবনের রোমাঞ্চকর যাত্রা আজ সমগ্র দেশের যুবসমাজকে নতুন করে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।
মহারাষ্ট্রের পুণে শহরে জন্মগ্রহণ করা নীলকান্তীর ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান ও পড়াশোনার প্রতি এক অদম্য আগ্রহ ছিল। তাঁর বাবা কেন্দ্রীয় উৎপুল্ক দপ্তরে চাকরির সুবাদে তাঁদের পরিবারকে বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল, যার ফলে শৈশব থেকেই নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে তাঁর নিবিড় পরিচয় ঘটেছিল। পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর বাবার একান্ত ইচ্ছা এবং নিজের অসামান্য বুদ্ধিমত্তার জোরে তিনি মর্যাদাপূর্ণ আইআইটি বা (IIT) প্রবেশিকা পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। সেই যুগে কোনো নারীর পক্ষে আইআইটি পরীক্ষায় সাফল্য পাওয়া এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পাওয়ার ঘটনা ছিল অত্যন্ত গৌরবের। কিন্তু নীলকান্তীর মন অন্য কিছু ভাবছিল। প্রথাগত বৃত্তিমূলক পড়াশোনার গণ্ডিতে নিজেকে বেঁধে না রেখে তিনি অভিনয় এবং নাট্যচর্চার প্রতি নিজের সুপ্ত ভালোবাসাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নিরাপদ কেরিয়ারের হাতছানি ছেড়ে তাঁর এই অভিনব পদক্ষেপ তাঁর জীবনের মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

রংমঞ্চের দুনিয়ায় পা রাখার পর খুব দ্রুতই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন নীলকান্তী। মারাঠি থিয়েটারের মঞ্চে তাঁর সাবলীল অভিনয় এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতা দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। ১৯৭৩ সালে মর্যাদাপূর্ণ মহারাষ্ট্র রাজ্য নাটক প্রতিযোগিতায় তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর স্বর্ণপদক অর্জন করেন, যা তাঁর অভিনয় জীবনের প্রথম বড় স্বীকৃতি ছিল। তবে সেই প্রাথমিক দিনগুলিতে জীবনকে টিকিয়ে রাখতে এবং আর্থিক স্থায়িত্ব বজায় রাখতে তিনি একটি ব্যাংকে চাকরিও করেছিলেন। ব্যাংকের চাকরি সামলানোর পাশাপাশি নাটকের মঞ্চের প্রতি তাঁর ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র ঘাটতি পড়েনি। পরবর্তীতে অভিনয়ই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান এবং একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। মারাঠি থিয়েটারের পাশাপাশি তিনি দক্ষ হাতে সংসার এবং অভিনয়—উভয় দিকই সমান পারদর্শিতায় সামলে গিয়েছেন, যা তাঁর দৃঢ় মানসিক শক্তির স্পষ্ট পরিচয় বহন করে।
অভিনয়ের মঞ্চে সক্রিয় থাকার সেই সোনালী দিনগুলিতেই নানা পাটেকরের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং সেই পরিচয় পরবর্তীতে ভালোবাসায় রূপ নেয়। ১৯৭৮ সালে নানা পাটেকরের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন নীলকান্তী। সেই সময় দুজনেই নিজেদের কেরিয়ারের লড়াইয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলেন। তবে দীর্ঘ বৈবাহিক জীবনে তাঁদের সম্পর্কের সমীকরণ সবসময় মসৃণ ছিল না। নানা পাটেকরের পেশাগত ব্যস্ততা, ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিতর্ক এবং নানা-মনীষা কৈরালার সম্পর্কের গুঞ্জনসহ জীবনের নানা কঠিন ঝড়ঝাপটা তাঁদের পরিবারকে সহ্য করতে হয়েছিল। এমনকি একসময় তাঁরা আলাদা থাকতে শুরু করলেও নিজেদের আইনি সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করেননি। এই সমস্ত ব্যক্তিগত প্রতিকূলতা এবং পারিবারিক ওঠাপড়ার মধ্যেও নীলকান্তী নিজের আত্মসম্মান এবং কেরিয়ারের মুন্সিয়ানা বিন্দুমাত্র হারাতে দেননি, বরং জীবনের প্রতিটি ধাক্কাকে তিনি আরও শক্ত হয়ে মোকাবিলা করেছেন।

অভিনেত্রী হিসেবেও তাঁর ঝুলিতে রয়েছে একাধিক স্মরণীয় সাফল্য। ১৯৮৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত জনপ্রিয় মারাঠি ছবি ‘আত্মবিশ্বাস’-এ অসাধারণ অভিনয় করার জন্য তিনি মহারাষ্ট্র সরকারের তরফ থেকে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কারে ভূষিত হন। এই সম্মান প্রমাণ করে দেয় যে তিনি কেবল কোনো প্রথম সারির অভিনেতার স্ত্রী নন, বরং নিজের যোগ্যতায় একজন অত্যন্ত শক্তিশালী অভিনেত্রী। সাম্প্রতিক সময়ে ভিকি কৌশল ও রश्मिका মন্দানা অভিনীত ব্লকবাস্টার ছবি ‘ছায়া’ বা (Chhaava)-তেও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে। আইআইটি পরীক্ষার সাফল্যকে দূরে ঠেলে দিয়ে থিয়েটারকে ভালোবেসে যে পথ তিনি বেছে নিয়েছিলেন, তা আজ সার্থক রূপ পেয়েছে। নানা পাটেকরের প্রয়াণের পর নীলকান্তী পাটেকরের এই আত্মত্যাগী ও সংগ্রামশীল জীবনকাহিনি ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসে চিরকাল এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।




