Sandip Ghosh Bail: আর জি কর দুর্নীতি মামলায় সন্দীপ ঘোষের জামিন ঘিরে ফুঁসছে চিকিৎসক মহল, সিবিআই ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন
রিপোর্ট: সৌমেন দাস
Kolkata: রাজ্যের স্বাস্থ্য মহলে তীব্র আলোড়ন ও গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করে দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় পর আর জি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আর্থিক দুর্নীতি মামলায় সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন পেলেন প্রতিষ্ঠানের বিতর্কিত প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই তিনি বিচারবিভাগীয় হেফাজতে ছিলেন, কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে মামলার শুনানিতে চরম দীর্ঘসূত্রিতা ও মাত্র ৭ জন সাক্ষীর জেরা সম্পন্ন হওয়ায় শীর্ষ আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করেছে। আদালতের এই রায়ের পরই নির্যাতিতার ন্যায়বিচার চেয়ে আন্দোলনরত চিকিৎসক সমাজ, জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট এবং বিভিন্ন চিকিৎসকদের সংগঠন তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। দুর্গাপুজোর আনন্দমুখর আবহের মাঝেই এই রায় সাধারণ মানুষ ও আন্দোলনকারীদের মনে গভীর আঘাত হেনেছে, যার ফলে রাজ্যের চিকিৎসা মহলে নতুন করে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
সন্দীপ ঘোষের এই জামিন পাওয়ার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্টের পক্ষ থেকে অত্যন্ত ক্ষোভের সুরে বলা হয়েছে যে বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে অভয়ার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় যেন আদতে কেউ দায়ীই নয়। সংগঠনের বিবৃত্তিতে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলা হয়েছে যে এই রায় যেন সমাজকে এই বার্তাই দিচ্ছে যে ‘নো ওয়ান কিল্ড অভয়া!’ বা অভয়াকে কেউ মারেনি। অভয়ার ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় যাঁরা এতদিন ধরে রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি, বরং প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার জায়গাটি মারাত্মকভাবে ধাক্কা খাচ্ছে। জুনিয়র চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে তীব্র কটাক্ষ করে এও বলা হয়েছে যে এবার হয়তো শুধু এটাই দেখার বাকি রয়েছে যে অভিযুক্ত সন্দীপ ঘোষকে পুনরায় স্বাস্থ্য ভবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে বা প্রিন্সিপাল কিংবা ডিএমই পদে ফিরিয়ে আনা হয় কি না।

তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের ভূমিকা এবং বর্তমান সরকারের ওপর তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন আর জি কর আন্দোলনের অন্যতম প্রতিবাদী মুখ ও চিকিৎসক নেতা দেবাশিস হালদার। তাঁর মতে, সিবিআইয়ের চরম অপদার্থতা, উদাসীনতা এবং বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতার ফলেই আজ এই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা সরকার পরিবর্তনের পর বড় বড় প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপ নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টরস এবং ডক্টর ফোরামের সভাপতি কৌশিক চাকি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে জামিন পাওয়া মানেই কেউ নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া নয়, কিন্তু এই সুযোগে হয়তো ফের একবার হাসপাতাল চত্বরে ‘থ্রেট কালচার’ ও দুর্নীতির সিন্ডিকেট মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। সন্দীপ ঘোষের সরকারি চাকরি বা তাঁর বাতিল হওয়া মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো ষড়যন্ত্র চলছে কি না, তা নিয়ে চিকিৎসক মহলে গভীর সন্দেহ ও সংশয় তৈরি হয়েছে।
সার্ভিস ডক্টরস ফোরাম এবং অন্যান্য চিকিৎসক সংগঠনের প্রতিনিধিরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার এই ধরনের নিষ্ক্রিয়তা ও কার্যপ্রণালী সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে চিরতরে ভেঙে দিচ্ছে। চিকিৎসক সজল বিশ্বাস সহ অন্যান্য সংগঠকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে সিবিআইয়ের ওপর থেকে ভরসা উঠে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং নির্যাতিতার পরিবারকে যেভাবে অবিচারের অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ফলস্বরূপ, উৎসবের এই দিনগুলি কাটতেই দুর্গোৎসবের ঠিক পরপরই আবারও রাজ্যজুড়ে বৃহত্তর আন্দোলন এবং রাজপথ দখলের ডাক দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের এই শক্ত অবস্থান প্রমাণ করে যে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা এই লড়াই থেকে একচুলও পিছু হটবেন না।

সব মিলিয়ে, আর জি কর হাসপাতালের আর্থিক দুর্নীতির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল মামলায় প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন লাভ শুধু একটি আইনি নির্দেশ নয়, বরং এটি সমগ্র বিচার প্রক্রিয়া ও তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে এক বিরাট জনমানসে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। একদিকে যেমন চিকিৎসকরা এই রায়কে এক প্রকার প্রশাসনিক ও বিচারিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে তেমনই দুর্গোৎসবের আবহেও এই আন্দোলন নতুন করে দানা বাঁধতে শুরু করেছে। আগামী দিনে এই জামিন সংক্রান্ত আইনি লড়াই এবং চিকিৎসকদের আন্দোলন রাজ্য রাজনীতি ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার প্রধান বিষয়। ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার থাকা চিকিৎসক সমাজের এই ক্ষোভ আগামী দিনে নতুন কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক রূপ নেয় কি না, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সমগ্র রাজ্যবাসী।




