Chorbagan Stampede Inquiry: চোরবাগান পদপিষ্টের ঘটনায় কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন রাজ্যের
রিপোর্ট: তানিয়া রায়
Kolkata: কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের মণ্ডপে ঘটে যাওয়া বেনজির ও মর্মান্তিক পদপিষ্টের ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যুর পর নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য প্রশাসন, এবং এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য কলকাতা হাই কোর্টের একজন বর্তমান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। রবিবার ভবানী ভবনে উচ্চপর্যায়ের পুলিশকর্তাদের সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের সুরক্ষা ও স্বচ্ছ তদন্ত সুনিশ্চিত করতে এই বিশেষ অনুসন্ধানকারী দলের নেতৃত্বে থাকবেন উচ্চ আদালতের একজন বর্তমান বিচারপতি, এবং এই বিষয়ে হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত অনুরোধ পাঠাবেন রাজ্যের মুখ্যসচিব। গত রাতের ওই ভয়াবহ বিপর্যয়ের দায়, ভিড় নিয়ন্ত্রণের চূড়ান্ত অব্যবস্থা এবং বিভিন্ন দপ্তরের ভূমিকা নিয়ে চারপাশে যখন তীব্র সমালোচনার ঝড় বইছে, ঠিক তখনই প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ধরনের কঠোর ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ গ্রহণের বার্তা দেওয়া হলো।
তদন্ত কমিটির গঠন বিন্যাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান যে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বাধীন এই কমিটিতে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের যুগ্মসচিব পদমর্যাদার নীচে নন, এমন একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিক, ডিজিপির প্রতিনিধি হিসেবে এডিজি পদমর্যাদার একজন অভিজ্ঞ আধিকারিক এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা এনডিআরএফ (NDRF)-এর একজন প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়েছে, যার মাধ্যমে কলকাতা পুলিশ, কলকাতা পুরসভা এবং দমকলের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলির ভূমিকা অত্যন্ত কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে মণ্ডপের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের গাফিলতি বা প্রশাসনিক ত্রুটি ছিল কি না, তাও এই উচ্চপর্যায়ী তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হয়।

ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান যে তিনি ব্যক্তিগতভাবে উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক দলকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন, এবং সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখার পরেই তিনি আসল ঘটনার ভয়াবহতা অনুধাবন করতে পেরেছেন। তাঁর প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মর্মান্তিক এই পদপিষ্টের ঘটনাটি মণ্ডপের ঠিক অভ্যন্তরে ঘটেনি, বরং বাইরের দিকের মূল গেটে অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে তৈরি হয়েছিল। সেখানে ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য দড়ি দিয়ে অস্থায়ীভাবে আলাদা যাতায়াতের পথ তৈরির ব্যবস্থা করা হয়েছিল, কিন্তু প্রবল বৃষ্টির সময় সেই দড়ি ধরে রাখার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা দড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। এমনকি এই কাজের সঙ্গে যুক্ত অস্থায়ী হোমগার্ডদের নামের তালিকাও ইতিমধ্যেই সর্বোচ্চ মহলের পক্ষ থেকে তলব করা হয়েছে, যাতে তাঁদের নিয়োগের সময়কাল এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা ছিল কি না তা সঠিকভাবে পরীক্ষা করা যায়।
চলতি দুর্গাপুজোর মরশুমে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর আগামী দিনে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে এখন থেকে প্রায় সমস্ত বড় পুজোতেই ভিড় নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত জোর দেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে সমস্ত প্যান্ডেলের ভিআইপি গেট বা বিশেষ প্রবেশদ্বার পুরোপুরি তুলে দেওয়া হবে। বিরোধী শিবিরের বিভিন্ন সমালোচনার তীব্র জবাব দিয়ে তিনি অতীতে ঘটে যাওয়া ২০২৫ সালের তড়িদাহত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা কিংবা দার্জিলিংয়ের হড়পা বাণে ভেসে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে পূর্ববর্তী প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতির আপডেট দিয়ে তিনি জানান যে এই দুর্ঘটনায় আহত হওয়া ২৫ জন ব্যক্তির মধ্যে দু’জনকে অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় আইসিইউ (ICU)-তে রাখা হয়েছে, এবং বাকি আহতদের চিকিৎসার অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করে সুস্থ হওয়াদের হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, চোরবাগানের এই ১৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর বিপর্যয় কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে এক গভীর ও অপূরণীয় কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল, যা প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। যাঁদের পরিবার এই ঘটনায় তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছেন, তাঁদের অন্তহীন কান্না ও বেদনা সমগ্র রাজ্যবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে, আর তাই এই বিচার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত রাখতে কোনো সংস্থাকেই আগাম ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। রাজ্যপাল এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সহ দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়মিত এই পরিস্থিতির খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং মুখ্যসচিব, কলকাতার পুলিশ কমিশনার, স্বরাষ্ট্রসচিব ও ডিজিপির সঙ্গে সমন্বয় রেখে গোটা পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। উৎসবের আনন্দ কীভাবে সামান্য অবহেলা ও অব্যবস্থার জেরে মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত হতে পারে, এই ঘটনা তারই এক নির্মম সাক্ষী হয়ে রইল, এবং আগামী দিনে বিচার ও নিরাপত্তার কড়া চাদরে মুড়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে প্রশাসন।




