Editorial Book Stall Vandalism: মতবাদকে লাঠি দিয়ে থামানো যায় না, বইয়ের স্টল ভাঙার সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রের সংকট নিয়ে ‘বাংলার আওয়াজ’-এর বিশেষ সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় কলম: কিংশুক সিংহ রায়
Kolkata: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে তিলোত্তমা কলকাতার বুকে বামপন্থীদের ঐতিহ্যবাহী বুকস্টলগুলি একের পর এক ভেঙে ফেলার যে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে আসছে, তা আজ গোটা রাজ্যজুড়ে এক গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। প্রধানত বিজেপি সমর্থকদের দিকে আঙুল উঠলেও, এই গোটা বিতর্কের পটভূমিতে উঠে আসছে বিধানসভার অন্দরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর একটি বিতর্কিত মন্তব্য, যাকে রাজনৈতিক মহলের একাংশ ‘স্টল করতে না দেওয়ার হুমকি’ হিসেবেই ব্যাখ্যা করছেন। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে যে মাঠপর্যায়ের এই হিংসাত্মক ভাঙচুর কি তবে সেই প্রচ্ছন্ন বার্তারই এক প্রকার প্রতিফলন? নাকি মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের পর গেরুয়া শিবির আরও বেশি উজ্জীবিত হয়ে এই বেআইনি ও অসহিষ্ণুতার পথে নেমেছে? এই জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের কোনো সরল বা একরৈখিক উত্তর হতে পারে না, কারণ একটি সুস্থ ও সচল গণতান্ত্রিক রাজ্যে বিরোধী মতাদর্শের বইয়ের স্টল থাকবে, এটাই তো রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে স্বাভাবিক ও কাঙ্ক্ষিত অঙ্গ।
সেই স্টল যদি প্রশাসনিক অনুমতির মারপ্যাঁচ বা জটিলতায় আটকে যায়, কিংবা কেউ মাঠে নেমে গায়ের জোরে তা ভেঙে দিয়ে চলে যায়—উভয় পরিস্থিতিই এ দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য এক অশনি সংকেত ছাড়া আর কিছুই নয়। শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কোনো মন্তব্য যদি মাঠপর্যায়ের কর্মী-সমর্থকদের কাছে অপরাধমূলক কাজের ‘সবুজ সংকেত’ বা ইন্ধন হিসেবে পৌঁছে যায়, তবে তার রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ থাকে না। পাশাপাশি এটিও সমানভাবে সত্য যে, মাঠে নেমে ঘটা প্রতিটি ভাঙচুরের ঘটনার নির্দিষ্ট আইনি দায় সরাসরি অভিযুক্তদের ওপরই বর্তায়, এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে। কেবল অনুমানের বা ধারণার ভিত্তিতে কোনো রাজনৈতিক শিবিরকে ঢালাওভাবে অপরাধী দাগিয়ে দেওয়া দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার কাজ হতে পারে না, তবে ক্ষমতার অলিন্দ থেকে আসা বার্তার দায়ভারও খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।

আসল এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বই বা মুক্ত চিন্তাকে ভয় পায় ঠিক কারা? উত্তরটা ইতিহাস নিজেই দিয়ে রেখেছে—যারা মুক্ত বুদ্ধির লড়াইয়ে এবং যুক্তির ময়দানে চিরকাল হারে, একমাত্র তারাই বই ছেনে বা পুড়িয়ে দেয়। বামপন্থী মতাদর্শের সঙ্গে যে কারও তীব্র দ্বিমত থাকতেই পারে, কিন্তু সেই রাজনৈতিক বা তাত্ত্বিক দ্বিমতের মীমাংসা কখনোই গায়ের জোর বা বুলডোজার দিয়ে হতে পারে না, তার জবাব দিতে হবে পাল্টা বই আর শক্তিশালী যুক্তির মাধ্যমেই। স্টল ভেঙে বা বই বিক্রি আটকে দিয়ে মতাদর্শের পথ রোধ করা যায় না, কারণ ইতিহাসের পাতা সাক্ষী রয়েছে যে মতবাদকে কোনো দিনই লাঠি বা অস্ত্রের জোরে স্থায়ীভাবে থামানো যায়নি এবং ভবিষ্যতেও যাবে না।
‘বাংলার আওয়াজ’-এর পক্ষ থেকে আমাদের অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন মত হলো—রাজ্যের প্রতিটি বুকস্টল ভাঙচুরের ঘটনার অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হোক, এবং যে দলেরই হোক না কেন, দোষীদের কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় পরিষ্কার করতে হবে যে, এই বাংলায় সর্বস্তরের সব মত ও পথের বইয়ের স্টল স্থাপনের সমান ও অবাধ অধিকার রয়েছে কি না। গণতন্ত্রের এই পবিত্র মঞ্চে সহনশীলতা ও বহুত্ববাদের পরিবেশ বজায় রাখা সরকারেরই প্রাথমিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।

সব মিলিয়ে, বইয়ের স্টল ভাঙার এই সংস্কৃতি প্রকারান্তরে আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। যুক্তির লড়াইকে যারা পেশি শক্তির দ্বন্দ্বে পরিণত করতে চায়, তারা আদতে সমাজের উদার ও মুক্ত চিন্তার মেরুদণ্ডটাই ভেঙে ফেলতে উদ্যত হয়েছে। বাংলা চিরকাল সংস্কৃতির আদান-প্রদান এবং মুক্ত আলোচনার পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত হয়ে এসেছে, সেই মাটিতে দাঁড়িয়ে এই ধরনের অসহিষ্ণুতা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা যায় না। সময় এসেছে রাজনৈতিক হানাহানি ও অন্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে বাক্স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকারকে সুরক্ষিত করার, অন্যথায় এই অন্ধকার একদিন আমাদের পুরো সমাজকেই গ্রাস করবে।




