Chorbagan Stampede SIT: চোরবাগানে পদপিষ্টের ১৯ মৃত্যুর ঘটনায় অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে ৬ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করল রাজ্য
রিপোর্ট: নিউজ ডেস্ক
Kolkata: কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবের মণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড় ও হুড়োহুড়ির জেরে ঘটে যাওয়া বেনজির ও মর্মান্তিক পদপিষ্টের ঘটনায় ১৯ জনের প্রাণহানির পর নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য প্রশাসন, এবং এই ঘটনার স্বচ্ছ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত সুনিশ্চিত করতে এবার একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ তদন্তকারী দল বা এসআইটি (SIT) গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হলো। গত শুক্রবার মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া এই হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেটির পর থেকেই সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দানা বাঁধতে শুরু করেছিল, যার প্রেক্ষিতে কলকাতা হাইকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতার স্বার্থে এই ছয় সদস্যের বিশেষ অনুসন্ধানকারী দল গঠন করা হয়েছে। প্রশাসনের এই ত্বরান্বিত পদক্ষেপে একদিকে যেমন প্রশাসনিক গাফিলতি ও নিরাপত্তার ত্রুটিগুলি খতিয়ে দেখার পথ প্রশস্ত হয়েছে, তেমনই অন্যদিকে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির দাবিও জোরালো হয়ে উঠেছে।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে গত ২১ অক্টোবর যে নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে, তাতে জানানো হয়েছে যে এই গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ তদন্তকারী দল বা এসআইটি-র চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন কলকাতা হাইকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী। নির্দেশিকায় স্পষ্ট করে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে আগামী তিন মাসের মধ্যে এই তদন্তকারী দলকে সম্পূর্ণ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করে তাদের বিস্তারিত রিপোর্ট ও প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা রাজ্য সরকারের কাছে জমা দিতে হবে। ৬ সদস্যের এই উচ্চপর্যায়ী দলে চেয়ারপার্সন ছাড়াও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন বিপর্যয় মোকাবিলা ও অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতরের প্রধান সচিব, রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বা এসটিএফ (STF)-এর ডিজি ও আইজিপি, রাজ্য পুলিশের ডিজির প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দফতরের প্রতিনিধি এবং কলকাতায় কর্মরত জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা এনডিআরএফ (NDRF)-এর একজন অভিজ্ঞ প্রতিনিধি।

তদন্তের পরিধি সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে প্রশাসন সূত্রে বলা হয়েছে যে চোরবাগানের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় কোনো ধরনের প্রশাসনিক গাফিলতি, সমন্বয়হীনতা বা কর্তব্যে অবহেলা ছিল কি না, তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখবে এই বিশেষ দল। দুর্ঘটনার নির্দিষ্ট সেই মুহূর্তে পুজো কমিটির আয়োজক, কর্তব্যরত পুলিশকর্মী, সিভিক ভলেন্টিয়ার, বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী, দমকল বাহিনী এবং চিকিৎসা ও অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা কেমন ছিল, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি ঘটনাস্থলের ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন বা সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ, বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া মোবাইল ভিডিও, পুলিশ কন্ট্রোল রুমের জরুরি নথি এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করে ফরেনসিক ও আইনি পরীক্ষা চালানো হবে।
এছাড়া পুজো মণ্ডপ নির্মাণের ক্ষেত্রে বৈধ লাইসেন্স দেওয়ার সময় সমস্ত সরকারি নিয়ম ও নির্দেশিকা যথাযথভাবে মানا হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও গভীর তদন্ত করা হবে। মণ্ডপ চত্বরে পর্যাপ্ত ও সুনির্দিষ্ট ভিড় নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা ছিল কি না এবং কোনো আপদকালীন বা জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে নিরাপদে ও দ্রুত বাইরে বের করে আনার জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল কি না, তা এই তদন্তের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে। পুলিশ প্রশাসন, কলকাতা পৌরসভা, পূর্ত দফতর এবং দমকলের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয়ের কোনো অভাব ছিল কি না, তা চিহ্নিত করে আগামী দিনে এই ধরনের জনবহুল উৎসবে যাতে কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় না ঘটে, তার জন্য কঠোর আইনি পদক্ষেপের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করবে এই এসআইটি।

সব মিলিয়ে, চোরবাগান সর্বজনীনের এই ১৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত এসআইটি-র এই উদ্যোগ রাজ্য রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থার সামনে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উৎসবের আনন্দ কীভাবে সামান্য অবহেলা, ভিড় ব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত ত্রুটি এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার জেরে মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত হতে পারে, এই ঘটনা তারই এক নির্মম শিক্ষা দিয়ে গেছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এই বিশেষ তদন্ত দল কী চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আনে এবং কাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সমগ্র রাজ্যবাসী। বিচার পাওয়ার এই দীর্ঘ লড়াইয়ে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই এখন প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।




