রিপোর্ট: কিংশুক সিংহ রায়, কলকাতা
KOLKATA: Amitabh Chakraborty বা রাজ্য বিজেপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ অমিতাভ চক্রবর্তীর সাংগঠনিক দক্ষতায় ফের একবার পূর্ণ আস্থা রাখল দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে দলের ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন সাফল্যের পর এবার রাজ্য সংগঠনে বড়সড় স্বস্তি পেলেন তিনি। সর্বভারতীয় বিজেপির পক্ষ থেকে প্রকাশিত নতুন তালিকায় স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) পদে অমিতাভ চক্রবর্তীই বহাল থাকছেন। দীর্ঘ টানাপোড়েন এবং রাজনৈতিক জল্পনার অবসান ঘটিয়ে রাজ্য বিজেপির সাংগঠনিক শীর্ষপদে তাঁর থেকে যাওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। দলের কেন্দ্রীয় স্তর থেকে এই আনুষ্ঠানিক অনুমোদন মেলার পর রাজ্য বিজেপির অন্দরে তাঁর অবস্থান যে আরও বহুগুণ শক্তিশালী হলো, তা বলাই বাহুল্য। ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে বাংলায় ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে তাঁর নেপথ্য ভূমিকাকেই এই বড় পুরস্কারের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন দলের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

সাংগঠনিক দায়িত্ব সামলানোর ক্ষেত্রে এই নিয়ে কার্যত হ্যাটট্রিক করলেন অমিতাভ চক্রবর্তী। রাজ্য বিজেপির ইতিহাসে টানা তিনবার সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) পদে থেকে যাওয়ার এই ঘটনা নিঃসন্দেহে এক বিরল নজির। ইতিপূর্বে দিলীপ ঘোষ যখন রাজ্য সভাপতি ছিলেন, সেই সময় থেকেই দক্ষতার সঙ্গে সহ-সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) পদের গুরুদায়িত্ব সামলেছেন তিনি। পরবর্তীকালে ড. সুকান্ত মজুমদার রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার সময় অমিতাভ চক্রবর্তীকে পূর্ণকালীন সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) করা হয়েছিল। সুকান্ত মজুমদারের গোটা মেয়াদকাল জুড়ে এবং পরবর্তী সময়েও দলের তৃণমূল স্তরের সংগঠনকে একসূত্রে বেঁধে রাখার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দিলীপ ঘোষ এবং সুকান্ত মজুমদার—উভয় নেতার আমলেই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করেছিলেন তিনি। এবার ২০২৬-এর কঠিন নির্বাচনী বৈতরণী পার করে দলকে সরকার গঠনের রাস্তায় নিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারিগর হিসেবে তাঁর এই মেয়াদ বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত প্রত্যাশিত ছিল।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বিজেপির সংসদীয় বোর্ডের বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় স্তরের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যের সংগঠন সম্পাদকদের নতুন তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। দলের সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিতিন নবীনের নতুন কমিটি যখন ঘোষিত হয়েছিল, তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) পদে বিএল সন্তোষই থাকছেন। এবার বিএল সন্তোষের সহকারীদের নাম এবং রাজ্যভিত্তিক সংগঠন সম্পাদকদের তালিকাও চূড়ান্ত করে দিল দল। তবে অমিতাভ চক্রবর্তী নিজের পদে বহাল থাকলেও, রাজ্য বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোয় একটি বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতদিন পর্যন্ত রাজ্য বিজেপির সহ-সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) পদে দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন সতীশ ধন্দ। কিন্তু নতুন তালিকায় সেই দায়িত্ব থেকে তাঁকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে রাজ্য বিজেপিতে সাংগঠনিক দিক থেকে অমিতাভ চক্রবর্তীর ক্ষমতা ও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আরও কিছুটা বৃদ্ধি পেল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

কেন্দ্রীয় স্তরেও এক বড়সড় সাংগঠনিক রদবদল ঘটিয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। সর্বভারতীয় স্তর থেকে এতদিন প্রতিটি রাজ্যের সাংগঠনিক কাজকর্ম তদারকি করতেন শিবপ্রকাশ। কিন্তু এবার তাঁর জায়গায় নতুন করে নিয়ে আসা হয়েছে বর্ষীয়ান নেতা সৌদান সিংকে। উল্লেখ্য, অতীতে রামলাল যখন বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) ছিলেন, সেই সময়ও সৌদান সিং এই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব সামলেছেন। পরবর্তীতে রামলালকে আরএসএসে ফিরিয়ে নেওয়ার পর বিএল সন্তোষ মূল দায়িত্বে আসেন এবং শিবপ্রকাশকে একমাত্র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছিল। এবার দলের সেই মেগা সাংগঠনিক সমীকরণে পুরনো ও অভিজ্ঞ মুখদের আবার ফিরিয়ে আনা হলো। সৌদান সিং এবং ভি সতীশ পুনরায় শীর্ষ সাংগঠনিক দায়িত্বে ফিরে এসেছেন। এর মধ্যে সর্বভারতীয় যুগ্ম সংগঠন সম্পাদক হিসেবে সৌদান সিংয়ের কাঁধে তুলে দেওয়া হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশা—এই চার প্রতিবেশী রাজ্যের সংগঠন দেখভালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অন্যদিকে, ভি সতীশকে দলের তফসিলি মোর্চা এবং সংসদীয় দফতরের সামগ্রিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় সরকার গঠনের পর দলের সাংগঠনিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে সংগঠনের সুসমন্বয় গড়ে তোলাই বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে রাজ্য সংগঠনের তালমিল নিখুঁত রাখতেই অমিতাভ চক্রবর্তীর মতো অভিজ্ঞ এবং পোড়খাওয়া সাংগঠনিক নেতার ওপর পুনরায় ভরসা রাখা হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন সময় দলের অন্দরে সাংগঠনিক মতবিরোধ তৈরি হলেও, শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আস্থা অর্জনে সফল হয়েছেন তিনি। সামনে রয়েছে লোকসভা থেকে শুরু করে রাজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন এবং উপনির্বাচন। সেই সমস্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি দলের নীচুতলার কর্মীদের সক্রিয় রাখতে অমিতাভ চক্রবর্তীর এই হ্যাটট্রিক দলের ভেতরে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বড় ভূমিকা নেবে। নতুন যুগ্ম সংগঠন সম্পাদক সৌদান সিংয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি আগামী দিনে বঙ্গ বিজেপির সংগঠনকে কোন পথে এগিয়ে নিয়ে যান, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল।




