Bandel: ব্যান্ডেলের বেসরকারি ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিটের লক্ষ লক্ষ টাকা উধাও! পুলিশের জালে ব্যাংক কর্মী
KOLKATA: Bandel বা হুগলি জেলার ব্যান্ডেল শহরে একটি সুপরিচিত বেসরকারি ব্যাংকে ঘটে যাওয়া এক বিপুল অঙ্কের আর্থিক জালিয়াতিকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ গ্রাহকদের ফিক্সড ডিপোজিট (FD) বা স্থায়ী আমানতের লক্ষ লক্ষ টাকা দিনের আলোতে গায়েব হয়ে গিয়েছে বলে মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। এই মেগা জালিয়াতির ঘটনায় নিখিল গুপ্তা নামে ওই বেসরকারি ব্যাংকেরই এক কর্মীকে পুলিশ ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করেছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, ব্যাংকের সুনাম এবং বিশ্বাসের ওপর ভরসা করে তাঁরা নিজেদের জীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ওই ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করেছিলেন। কিন্তু মেয়াদ শেষে বা দরকারে সেই টাকা তুলতে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন যে ব্যাংকের রেকর্ডে তাঁদের নামে কোনো টাকাই জমা নেই! এই অভাবনীয় খবর প্রকাশ্যে আসতেই ব্যান্ডেল মোড় সংলগ্ন ওই ব্যাংকের সামনে গ্রাহকদের বিক্ষোভ আছড়ে পড়ে এবং গোটা এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

ঠিক কীভাবে এই মেগা জালিয়াতির ছক কষা হয়েছিল? স্থানীয় এবং পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই ব্যান্ডেলের ওই নির্দিষ্ট বেসরকারি ব্যাংকে বহু সাধারণ মানুষ তাঁদের সঞ্চিত অর্থ ফিক্সড ডিপোজিট করে আসছিলেন। অভিযোগের তির সরাসরি ওই ব্যাংকের কর্মী নিখিল গুপ্তার দিকে। নিখিলই মূলত গ্রাহকদের এফডি সংক্রান্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং সুদের হারের তথ্য দিয়ে তাঁদের টাকা জমা করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতেন। গ্রাহকদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য এফডি করার পর তাঁদের হাতে ব্যাংকের নিজস্ব প্যাডে তৈরি সার্টিফিকেট এবং রসিদ তুলে দেওয়া হতো। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, সেই নথিতে ব্যাংকের নামের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মী নিখিল গুপ্তার এমপ্লয়ি কোড এবং ব্যাংকের অরিজিনাল স্ট্যাম্পও মারা থাকত। ফলে কোনো গ্রাহকই ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করতে পারেননি যে তাঁদের হাতে থাকা ওই স্ট্যাম্প-মারা সার্টিফিকেটগুলো আসলে সম্পূর্ণ ভুয়ো এবং জাল।
আরও পড়ুন: Pranati Nayak: এশিয়ান গেমসে ইতিহাস বাংলার মেয়ের! জিমন্যাস্টিক্সের ভল্ট ফাইনালে প্রণতি নায়েক
এই জালিয়াতির শিকার হওয়া ব্যান্ডেলের বাসিন্দা ইন্দ্রজিৎ কৌর সংবাদমাধ্যমের কাছে তাঁর চরম ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, নিখিল গুপ্তার মাধ্যমে তিনি ব্যাংকে প্রায় সাড়ে ২৫ লক্ষ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট করিয়েছিলেন এবং তাঁর কাছে নিখিলের দেওয়া স্ট্যাম্প-সহ সার্টিফিকেটও সযত্নে রাখা ছিল। কিন্তু কয়েক দিন আগে হঠাৎ সন্দেহ হওয়ায় তিনি ব্যাংকে গিয়ে নিজের ওই নথিগুলি যাচাই করান। সেখানেই ব্যাংক আধিকারিকরা তাঁকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, ওই এফডি সার্টিফিকেটের বিপরীতে ব্যাংকের মূল রেকর্ডে কোনো টাকাই জমা নেই! বিষয়টি জানার পর কার্যত মাথায় হাত পড়ে যায় ইন্দ্রজিতের। একই অভিযোগ করেছেন ব্যান্ডেল মেরি পার্কের বাসিন্দা অনুশ্রী সেনগুপ্তা। তাঁদের পরিবারের একাধিক সদস্য মিলে ব্যাংকে প্রায় ৯ লক্ষ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট করেছিলেন। অনুশ্রীর দাবি, তাঁরা কোনো ব্যক্তিগত কর্মীকে দেখে নয়, বরং ব্যাংকের সুনামের ওপর ভরসা করেই টাকা রেখেছিলেন। আরেক গ্রাহকের প্রায় ১২ লক্ষ টাকাও একইভাবে গায়েব হয়ে গিয়েছে বলে খবর। এখন সেই টাকা কীভাবে ফেরত পাওয়া যাবে, তা নিয়ে তাঁরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

মঙ্গলবার সকালে এই জালিয়াতির খবর ছড়িয়ে পড়তেই ব্যান্ডেল মোড়ের কাছে অবস্থিত সংশ্লিষ্ট বেসরকারি ব্যাংকের সামনে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা জড়ো হয়ে তুমুল বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে শুরু করেন। প্রথমে তাঁরা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে নিজেদের টাকা ফেরতের জোরালো দাবি জানান এবং পরে পুলিশের কাছে নিখিল গুপ্তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। গ্রাহকদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং অভিযুক্ত ব্যাংক কর্মী নিখিল গুপ্তাকে গ্রেপ্তার করে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, নিখিল বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে রয়েছে এবং তাকে দফায় দফায় জেরা করে এই জালিয়াতির গভীরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। তবে ঠিক কত জন সাধারণ গ্রাহক এই মেগা আর্থিক প্রতারণার শিকার হয়েছেন এবং মোট কত কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান এখনও পর্যন্ত পুলিশের কাছে স্পষ্ট নয়।
এই মেগা জালিয়াতির ঘটনায় খোদ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়েও সাধারণ মানুষের মনে একাধিক বড়সড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। গ্রাহকদের একটাই প্রশ্ন, ব্যাংকের অরিজিনাল নাম, স্ট্যাম্প এবং কর্মীর এমপ্লয়ি কোড-সহ নথি হাতে থাকার পরেও কীভাবে তাঁদের জমা করা টাকা ব্যাংকের রেকর্ডে ঢুকল না? এর দায় কি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এড়াতে পারে? এই বিষয়ে ওই বেসরকারি ব্যাংকের ম্যানেজার বিপ্লব কুমার মণ্ডল জানিয়েছেন যে, সম্পূর্ণ বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে এবং তাঁরা সমস্ত দিক অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছেন। ব্যাংকের উচ্চতর আধিকারিকদের নিয়ে একটি বিশেষ দল গঠন করে ইতিমধ্যেই অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তিনি গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে বলেছেন যে খুব তাড়াতাড়ি এই জালিয়াতির আসল সত্য সামনে আসবে। পুলিশ এবং ব্যাংকের নিজস্ব তদন্তের পরই এই মেগা দুর্নীতির পেছনের অন্যান্য মাথাদের নামও প্রকাশ্যে আসতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। আপাতত নিজেদের কষ্টার্জিত টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন প্রতারিত গ্রাহকরা।




