Bikash Ranjan Bhattacharya: হিন্দু ধর্ম এবং হিন্দুত্ববাদের পার্থক্য বুঝিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে পালটা তোপ প্রবীণ সিপিএম নেতার
Kolkata: রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বেঁধে দেওয়া আটচল্লিশ ঘণ্টার চরম সময়সীমা বা ডেডলাইন পেরিয়ে যাওয়ার পরেও নিজের সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ অনড় রইলেন প্রবীণ সিপিএম নেতা তথা বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। নিজের বাসভবনে হওয়া এক বর্বরোচিত হামলার ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে একটি ফেসবুক পোস্টে তিনি আক্রমণকারীদের ‘হিন্দুত্ববাদী’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর এই নির্দিষ্ট শব্দচয়নকে কেন্দ্র করেই রাজ্য রাজনীতিতে এক বিশাল বিতর্কের সূত্রপাত হয়। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী একটি জনসভা থেকে তাঁকে ওই শব্দটি প্রত্যাহার করার জন্য কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। কিন্তু রবিবার সেই নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার পরেও প্রবীণ এই বামপন্থী নেতা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি কোনো অবস্থাতেই তাঁর ওই ফেসবুক পোস্ট সংশোধন করবেন roll না বা ওই বিতর্কিত শব্দটি প্রত্যাহার করবেন না। তাঁর এই অনড় অবস্থানের ফলে রাজ্য রাজনীতিতে এবং শাসক দলের সঙ্গে বাম শিবিরের এক নতুন করে আইনি ও রাজনৈতিক সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এই নজিরবিহীন বিতর্কের একেবারে সূত্রপাত হয়েছিল গত বৃহস্পতিবার খুব ভোরে। অভিযোগ অনুযায়ী, যাদবপুর চত্বরে অবস্থিত বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের বাড়িতে আচমকাই হামলা চালায় বেশ কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতী। মুখে কাপড় বাঁধা অবস্থায় ওই দুষ্কৃতীরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাঁর বাড়ি লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি পাথর এবং কাঁচের বোতল ছুড়তে শুরু করে। এই অতর্কিত হামলায় তাঁর বাড়ির জানলার কাঁচ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। এই মর্মান্তিক এবং ভয়ংকর ঘটনার ঠিক পরেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হন তিনি। নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ পোস্ট করে তিনি এই কাপুরুষোচিত হামলার নেপথ্যে সরাসরি ‘হিন্দুত্ববাদী গুন্ডা’দের দিকে আঙুল তোলেন। যদিও এই ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ ইতিমধ্যেই দু’জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করেছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এবং দাবিতে উঠে এসেছে যে, ওই ধৃত দুষ্কৃতীদের সঙ্গে আদতে রাজ্যের অন্যতম বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও নিজের প্রাথমিক অবস্থান থেকে এক চুলও সরতে নারাজ বিকাশরঞ্জন।
![]()
পুলিশের তদন্তে ধৃতদের সঙ্গে তৃণমূলের যোগ থাকার বিষয়টি সামনে আসার পরেই বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের ওই ফেসবুক পোস্ট এবং ‘হিন্দুত্ববাদী’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে সরাসরি তীব্র আপত্তি জানান রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সম্প্রতি একটি জনসভা থেকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত কড়া ভাষায় প্রবীণ এই আইনজীবীর সমালোচনা করেন। তিনি প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে বিকাশরঞ্জনকে তাঁর ওই ফেসবুক পোস্ট থেকে বিতর্কিত শব্দটি অবিলম্বে প্রত্যাহারের জন্য চরম আটচল্লিশ ঘণ্টার একটি ডেডলাইন বা সময়সীমা বেঁধে দেন। পাশাপাশি তিনি এও হুঁশিয়ারি দেন যে, যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ওই শব্দটি সংশোধন বা মুছে ফেলা না হয়, তবে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে বা ব্যক্তিগত স্তরে তাঁর বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। একজন মুখ্যমন্ত্রীর তরফ থেকে রাজ্যের একজন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং বিরোধী দলের বর্ষীয়ান নেতাকে এহেন প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দেওয়ার ঘটনাটি বঙ্গ রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব উত্তেজনার জন্ম দেয় এবং রাজনৈতিক মহলে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে।
কিন্তু রবিবার সেই চরম আইনি সময়সীমা বা ডেডলাইন শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও নিজের অবস্থানে অটল রয়েছেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি পালটা যুক্তি দিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, “আমি কেন আমার পোস্ট থেকে ওই শব্দটা ডিলিট করব? অপরাধ করেছে ওরা, আর আমাকে শব্দ প্রত্যাহার করতে হবে?” নিজের ওই শব্দচয়নের সপক্ষে একটি অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও দিয়েছেন এই দুঁদে আইনজীবী। তাঁর মতে, হিন্দু ধর্ম এবং হিন্দুত্ববাদ কখনোই এক বিষয় হতে পারে না। হিন্দুত্ববাদকে তিনি সরাসরি গুন্ডামির এবং রাজনৈতিক আগ্রাসনের একটি তত্ত্ব বলে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে, প্রকৃত হিন্দুত্বের ধারণা বা হিন্দু ধর্মের মূল নির্যাস হলো বহুত্ববাদ, পরমতসহিষ্ণুতা এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষকে আপন করে গ্রহণ করার মহান শিক্ষা। তাই হিন্দু ধর্মের পবিত্রতার সঙ্গে উগ্র হিন্দুত্ববাদের এই হিংসাত্মক রাজনীতির যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে, সেটাই তিনি সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন বলে দাবি করেছেন।

শুধুমাত্র নিজের তত্ত্বের ব্যাখ্যা দিয়েই থেমে থাকেননি বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, তিনি সরাসরি রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান তথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশ দেওয়ার আইনি অধিকার নিয়েও বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির জবাবে প্রবীণ এই সিপিএম নেতার পালটা প্রশ্ন, “আপনাকে এই নির্দেশ দেওয়ার বা আমার বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অধিকার কে দিয়েছে?” তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আইনি পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে তাঁকে চুপ করানো যাবে না এবং মুখ্যমন্ত্রীকে আগে নিজের এই ধরনের নির্দেশ দেওয়ার অধিকারের পক্ষে আইনি যুক্তি জনসমক্ষে প্রমাণ করতে হবে। ফলে আটচল্লিশ ঘণ্টার সেই চরম সময়সীমা অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পরও বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের এই আপসহীন এবং অনড় অবস্থান রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের আগুন উসকে দিয়েছে। এখন এটাই দেখার বিষয় যে, এই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর সরকার বা মুখ্যমন্ত্রী সত্যি সত্যিই কোনো কড়া আইনি পদক্ষেপের পথে হাঁটেন কি না, নাকি রাজনৈতিক তরজার মাধ্যমেই এই বিতর্কের জল আরও বহু দূর গড়ায়।



