Mahalaya and Navratri Connection: আবাহন, আত্মশুদ্ধি এবং মাতৃ আরাধনার এক অপূর্ব শাস্ত্রীয় মেলবন্ধন
Kolkata: আজ রাত পোহালেই সেই বহু প্রতীক্ষিত মাহেন্দ্রক্ষণ, পুণ্য তিথি মহালয়া। ভোরের আকাশে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠের চণ্ডীপাঠ আর রেডিওর সেই চেনা সুরে আপামর বাঙালির হৃদয়ে বেজে উঠবে দেবীপক্ষের আগমনী বার্তা। আবার পঞ্জিকার হিসেব অনুযায়ী, মহালয়া পেরোনোর ঠিক পরের দিন অর্থাৎ আগামী রবিবার থেকেই সারা দেশজুড়ে শুরু হয়ে যাচ্ছে পবিত্র নবরাত্রি উৎসব। এই সময়টায় একদিকে যেমন মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার মৃন্ময়ী রূপকে চিন্ময়ী করে তোলার প্রস্তুতি একেবারে তুঙ্গে ওঠে, ঠিক তেমনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয় নবদুর্গার একনিষ্ঠ আরাধনা। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে প্রায়শই একটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন জাগে যে, মহালয়া, নবরাত্রি এবং বাঙালির প্রাণের উৎসব দুর্গাপুজোর মধ্যে ঠিক কী শাস্ত্রীয় বা আধ্যাত্মিক সম্পর্ক রয়েছে? এই তিন উৎসব কি একে অপরের পরিপূরক, নাকি এদের মধ্যে রয়েছে কোনো সম্পূর্ণ ভিন্ন শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা? উৎসবের এই পুণ্যলগ্নে দাঁড়িয়ে আজ আমরা সেই ঐশ্বরিক এবং শাস্ত্রীয় সম্পর্কেরই এক গভীর অনুসন্ধান করব।
মহালয়া হলো মূলত একটি সন্ধিক্ষণ বা আধ্যাত্মিক সেতু, যা পিতৃপক্ষ এবং দেবীপক্ষের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। হিন্দু ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের ১৫ দিন হলো পিতৃপক্ষ, যা পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের সময়। মহালয়ার পুণ্য লগ্নে তর্পণের মাধ্যমে সেই পিতৃপক্ষের অবসান ঘটে এবং শুরু হয় মাতৃ শক্তির আরাধনার কাল বা দেবীপক্ষ। শাস্ত্র মতে, মহালয়ার দিনেই মহিষাসুরকে বধ করার জন্য ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর নিজেদের তেজ একত্রিত করে দেবী দুর্গার সৃষ্টি করেছিলেন। তাই মহালয়া হলো অশুভ শক্তির বিনাশের জন্য মহাশক্তির মর্ত্যে আবাহন করার দিন। এই দিনটিতে পিতৃপুরুষরা তৃপ্ত হয়ে মর্ত্যলোক ত্যাগ করেন এবং তাঁদের আশীর্বাদ নিয়ে মর্ত্যে অবতীর্ণ হন দেবী দুর্গা। সুতরাং, মহালয়া হলো সেই ভিত বা প্রস্তুতি পর্ব, যার ওপর দাঁড়িয়ে নবরাত্রি এবং দুর্গাপুজোর মতো এক বিশাল আধ্যাত্মিক ইমারত গড়ে ওঠে। মহালয়া ছাড়া দেবীপক্ষের সূচনা বা নবরাত্রির আরাধনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

মহালয়া বা অমাবস্যা তিথি কেটে যাওয়ার ঠিক পরের দিন, অর্থাৎ প্রতিপদ তিথি থেকে শুরু হয় পবিত্র নবরাত্রি। ‘নবরাত্রি’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো নয়টি রাত। এই নয়টি রাত এবং দশটি দিন ধরে মা দুর্গার নয়টি ভিন্ন ভিন্ন রূপ বা ‘নবদুর্গা’-র আরাধনা করা হয়। এই নয়টি রূপ হলো—শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী এবং সিদ্ধিদাত্রী। ভারতের উত্তর, পশ্চিম এবং মধ্যাঞ্চলে এই নয় দিন ধরে ভক্তরা কঠোর উপবাস রাখেন, ভজন কীর্তন করেন এবং গরবা বা ডান্ডিয়া নৃত্যের মাধ্যমে দেবী শক্তির আরাধনা করেন। নবরাত্রির মূল আধ্যাত্মিক তাৎপর্য হলো মানুষের ভেতরের অশুভ প্রবৃত্তিগুলিকে বিনাশ করে নিজের আত্মাকে শুদ্ধ করা। প্রথম তিন দিন দেবী দুর্গার আরাধনা করে অশুভ শক্তির বিনাশ করা হয়, পরের তিন দিন দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করে আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্য লাভ করা হয় এবং শেষ তিন দিন দেবী সরস্বতীর আরাধনা করে পরম জ্ঞান অর্জন করা হয়।
এবার আসা যাক বাঙালির প্রাণের উৎসব দুর্গাপুজোর কথায়। নবরাত্রি যেখানে পূর্ণ নয় দিনের এক আধ্যাত্মিক যাত্রা, সেখানে পূর্ব ভারতের বাংলা, অসম, ত্রিপুরা বা ওড়িশায় দুর্গাপুজোর মূল আরাধনা শুরু হয় নবরাত্রির ষষ্ঠ দিন বা ষষ্ঠী তিথি থেকে। মহালয়ার দিন দেবীর আবাহন হলেও, ষষ্ঠীতে বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মাধ্যমে মূল পুজোর সূচনা হয় এবং দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটে। এখানে দেবী দুর্গাকে শুধুমাত্র এক মহাশক্তিশালী অসুরদলনী হিসেবেই পুজো করা হয় না, বরং তাঁকে ঘরের মেয়ে ‘উমা’ হিসেবেও আপন করে নেওয়া হয়। বাঙালি বিশ্বাস করে, উমা তাঁর চার সন্তান—লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশকে নিয়ে কৈলাস থেকে বাপের বাড়িতে চার দিনের জন্য ছুটি কাটাতে আসেন। তাই দুর্গাপুজোয় শাস্ত্রীয় গাম্ভীর্যের পাশাপাশি এক অদ্ভুত পারিবারিক আবেগ এবং বাৎসল্য রস মিশে থাকে। তবে রীতিনীতি ভিন্ন হলেও, দুর্গাপুজোর ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত তিথিগুলি আসলে নবরাত্রিরই শেষ চারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন।

সুতরাং, সামগ্রিকভাবে বিচার করলে দেখা যায় যে, মহালয়া, নবরাত্রি এবং দুর্গাপুজো—এই তিনটি আসলে একই আধ্যাত্মিক সুতোয় গাঁথা এক অখণ্ড উৎসব। মহালয়া হলো সেই উৎসবের সূচনা বা অ্যালার্ম বেল, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মা আসছেন। নবরাত্রি হলো সেই মহাশক্তির নয় দিনব্যাপী এক বিস্তৃত আরাধনা, যা ভক্তের আত্মশুদ্ধি ঘটায়। আর দুর্গাপুজো হলো সেই আরাধনার চরম পরিণতি বা ক্লাইম্যাক্স, যেখানে দেবীর অসুরবিনাশী রূপ এবং মাতৃরূপের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটে। দশমীর দিন একদিকে যেমন বাঙালি চোখে জল নিয়ে মাকে বিদায় জানায়, ঠিক তেমনই সারা দেশের মানুষ ‘বিজয়াদশমী’ বা ‘দশেরার’ মাধ্যমে রাবণের ওপর ভগবান রামের জয় অর্থাৎ অশুভের ওপর শুভের জয় উদযাপন করে। রূপ, রীতি বা আচারের বাহ্যিক পার্থক্য থাকলেও, এই তিনটি পর্বের মূল সুরটি কিন্তু একেবারে এক—আর তা হলো অন্ধকারের ওপর আলোর জয়, অশুভের ওপর শুভের জয় এবং মাতৃশক্তির প্রতি এক পরম আত্মসমর্পণ।![]()



