Election Commission Editorial: মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে কেন আড়াল করছে বিজেপি? জ্ঞানেশ কুমারের অতীত হাতড়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য
Election Commission Editorial: একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন কমিশন হলো সবচেয়ে বড় স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বর্তমান সময়ে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে যে চরম টানাপোড়েন শুরু হয়েছে, তা এই প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে এক গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দেশজুড়ে বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিরোধী দলগুলি যখন একযোগে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সুর চড়াচ্ছে, তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখছে গোটা দেশ। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নিজে কোনো সাফাই দেওয়ার আগেই তাঁকে রক্ষা করতে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের শাসকদল বিজেপি। বিভিন্ন রাজ্যের অন্তত এক ডজন বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী এবং শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলন করে ঘোষণা করছেন যে তাঁরা জ্ঞানেশ কুমারের পাশে আছেন। কিছু হিন্দুত্ববাদী সংগঠন তো তাঁকে ভারতরত্ন দেওয়ার দাবি পর্যন্ত তুলেছে। একটি স্বাধীন সাংবিধানিক পদের আধিকারিককে বাঁচাতে কেন শাসকদল এতটা মরিয়া হয়ে উঠল, তার উত্তর খুঁজতে গেলে এই আমলার অতীত কর্মজীবনের পাতা ওলটানো অত্যন্ত জরুরি।

আরও পড়ুন: PM Modi on Gandhi Jayanti: উন্নত ভারত গড়তে বাপুর আদর্শই দিশা! দেশবাসীকে ৫টি বার্তা মোদীর
জ্ঞানেশ কুমারের আমলাতান্ত্রিক জীবনের গতিপথটি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং তাৎপর্যপূর্ণ। কেরল ক্যাডারের একজন দক্ষ আইএএস আধিকারিক হিসেবে দীর্ঘ আঠারো বছর কাজ করার পর তিনি দিল্লিতে বদলি হন এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, তিনি খুব দ্রুত কেন্দ্রের বর্তমান সরকারের সবচেয়ে আস্থাভাজন আধিকারিকদের নিয়ে গঠিত বিশেষ কোর টিমের সদস্য হিসেবে জায়গা করে নেন। দুই হাজার উনিশ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকারের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক প্রকল্প—জম্মু ও কাশ্মীরের তিনশো সত্তর নম্বর ধারা এবং পঁয়ত্রিশ এ ধারা বিলোপের ক্ষেত্রে তিনি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই বিলের অন্তত বারোটি খসড়া তৈরি করা এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সই সংগ্রহ করার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল কাজগুলি তাঁর হাত দিয়েই সম্পন্ন হয়েছিল। প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, সেই ঐতিহাসিক পদক্ষেপের সফল রূপায়ণ তাঁকে শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বের অত্যন্ত কাছের মানুষে পরিণত করেছিল।

কাশ্মীর পর্বের পরেই তাঁর কাঁধে আরও একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং শাসকদলের আদর্শগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক নির্দেশের পর অযোধ্যার রামমন্দির নির্মাণের তদারকি করার জন্য যে বিশেষ ডেস্ক তৈরি হয়েছিল, তার মূল দায়িত্ব পান জ্ঞানেশ কুমার। রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট গঠন থেকে শুরু করে সারা দেশ থেকে মন্দির নির্মাণের জন্য প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি চাঁদা সংগ্রহের গোটা প্রক্রিয়ার নেপথ্যে ছিলেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে যে, এই ট্রাস্টের আর্থিক লেনদেন এবং পরিচালনা পদ্ধতি অত্যন্ত অস্বচ্ছ ছিল, যা পরবর্তীকালে মন্দিরের জমি কেনা নিয়ে বড়সড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। দুই হাজার চব্বিশ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি নিজের আমলাতান্ত্রিক কর্মজীবন থেকে সরকারিভাবে অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু শাসকদলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন প্রাক্তন আমলা হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক উপযোগিতা যে একটুও কমেনি, তা তাঁর অবসরের ঠিক দু’মাস পরেই দেশের মানুষ দেখতে পান।

আরও পড়ুন: Gyanesh Kumar Resignation Protest: উত্তাল দিল্লি ও মুম্বই! পদত্যাগের দাবিতে চরম বিক্ষোভ
লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে নির্বাচন কমিশনে যখন বিরাট শূন্যতা তৈরি হয়, তখন তড়িঘড়ি দেশের প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাই কমিটি থেকে সরিয়ে একজন কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মধ্যরাতের এক নজিরবিহীন বৈঠকে বিরোধী দলনেতার সমস্ত আপত্তিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দুইশো বারো জন আধিকারিকের তালিকা থেকে জ্ঞানেশ কুমারকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ করে সরকার পক্ষ। পরবর্তীতে তাঁকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার করা হয়। তাঁর নিয়োগের পাশাপাশি তাঁর পারিবারিক বৃত্তের সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া চলাকালীন তাঁর কন্যা মেধা রূপম প্রশাসনিক আধিকারিক হিসেবে প্রায় ষাট জন বুথ লেভেল অফিসারের বিরুদ্ধে নজিরবিহীনভাবে এফআইআর দায়ের করেন। অন্যদিকে, তাঁর জামাতা মণীশ বনসল লোকসভা নির্বাচনের সময় উত্তরপ্রদেশের সম্বল জেলার জেলাশাসক হিসেবে সংখ্যালঘু ভোটারদের বাধা দেওয়ার অভিযোগকে কার্যত খারিজ করে দিয়েছিলেন। এই সমস্ত স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগগুলি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতাকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি যত জোরালো হচ্ছে, বিজেপির তরফ থেকে তাঁকে আড়াল করার চেষ্টাও ঠিক ততটাই প্রকট হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাসকদলের এই নিঃশর্ত সমর্থনের প্রধান কারণ হলো জ্ঞানেশ কুমারের সেই অতীত আনুগত্য এবং সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে তাঁর নীরব কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা। কিন্তু এই গোটা বিতর্কের গভীরে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত লুকিয়ে রয়েছে। নির্বাচন কমিশন কোনো একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির চেয়ে অনেক বড় একটি প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্তাকে যদি শাসকদলের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয় বা শাসকদল যদি তাঁকে রক্ষাকর্তা হিসেবে আগলে রাখে, তবে সাধারণ মানুষের চোখে নির্বাচনের স্বচ্ছতা সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যায়। জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা দেবেন কি দেবেন না, তা হয়তো ভবিষ্যৎ বলবে, কিন্তু একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে তার হৃত মর্যাদা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের জন্য যে কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে, তা আজ দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট।




