Flyover Accident Kolkata: ফ্লাইওভারের নতুন রঙে পিচ্ছিল রাস্তা, বৃষ্টির পর বাইক চালকদের দুর্দশায় তুঙ্গে বিতর্ক
রিপোর্ট: কিংশুক সিংহ রায়
Kolkata: বৃষ্টির ঠিক পরপরই কলকাতার সদ্য রং করা ফ্লাইওভারগুলির ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় একাধিক মোটরবাইক পিছলে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার ঘটনায় সমগ্র শহরজুড়ে তীব্র নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত বুধবার বিকেলে কলকাতার অত্যন্ত ব্যস্ততম দুই রুট তথা চিংড়িহাটা এবং গড়িয়াহাট ফ্লাইওভারের ওপর বৃষ্টির জল জমার পরেই রঙের পিচ্ছিল আস্তরণের কারণে পরপর বেশ কয়েকটি বাইক ও চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তায় ছিটকে পড়েন। এই দুর্ঘটনার একটি ভয়াবহ ভিডিও ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই সাধারণ নাগরিক ও বাইক আরোহীদের মনে ক্ষোভ এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শহরের পরিকাঠামো উন্নত না করে শুধুমাত্র বাহ্যিক সৌন্দর্য বা রঙের প্রলেপ লাগানোর এই প্রবণতা যে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সমান, তা নিয়ে ওয়াকিবহাল মহল তীব্র প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। প্রশাসনের এই ধরনের অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত যে প্রকাশ্য দিনের আলোয় সাধারণ মানুষের সুরক্ষাকে বিঘ্নিত করছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসেরই বেলেঘাটা বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক কুণাল ঘোষ এই ঘটনার একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন, যেখানে ভেজা ও রঙিন রাস্তার ওপর বাইক এবং চালকদের মাটিতে পড়ে থাকতে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। এছাড়া সল্টলেকের এক স্থানীয় বাসিন্দা সংবাদমাধ্যমকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেছেন যে তিনি যখন নিজের মেয়ের সঙ্গে চিংড়িহাটা ফ্লাইওভার দিয়ে গাড়ি চালিয়ে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তিনি চোখের সামনে একের পর এক বাইক চালককে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পিছলে পড়তে দেখেন। যদিও শেষ পর্যন্ত দুর্ঘটনায় আহত হওয়া চালক বা সওয়ারিদের শারীরিক আঘাতের সঠিক প্রকৃতি বা তীব্রতা কেমন ছিল, সে বিষয়ে পুলিশ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য এখনও পর্যন্ত জানানো হয়নি, তবে এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা যে শহরের ট্রাফিক সুরক্ষাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

এই গোটা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল গত মঙ্গলবারই এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন যে ফ্লাইওভারের ওপর ব্যবহার করা এই রংগুলি আদতে স্থায়ী কোনো উপাদান নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তীব্র বৃষ্টিপাত হলে এই রং সহজেই ধুয়ে মুছে যেতে পারে অথবা বড়জোর চার থেকে পাঁচ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। কিন্তু প্রথম দফার হালকা বা মাঝারি বৃষ্টির পরেই যে ধরনের বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হলো এবং বাইকচালকরা দুর্ঘটনার কবলে পড়লেন, তাতে মন্ত্রীর এই হালকা মন্তব্য সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নগরোন্নয়ন দপ্তরের এহেন অবৈজ্ঞানিক ও অপরিকল্পিত পরিকল্পনা নিয়ে নাগরিকদের মনে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে যে, স্থায়ী সমাধানের পথ ছেড়ে কেন এমন অস্থায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ সৌন্দর্যায়নের পথ বেছে নেওয়া হলো?
এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে থেকেই যে প্রশাসনিক স্তরে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল, তা এদিনের ঘটনার পর আরও জোরালোভাবে সামনে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির অন্যতম সাধারণ সম্পাদক আশুতোষ চট্টোপাধ্যায় এই সম্ভাব্য বিপদের কথা আগেই উপলব্ধি করে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং কলকাতা পুরনিগমের কমিশনার তথা প্রশাসক স্মিতা পান্ডেকে একটি লিখিত চিঠি পাঠিয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তিনি সেই চিঠিতে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছিলেন যে রাস্তায় যে ধরনের রং ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে স্কিড রেজিস্ট্যান্স বা পিছলে যাওয়া রোধ করার ক্ষমতা অত্যন্ত কম থাকে, যা টু-হুইলার চালক এবং অন্যান্য গাড়িচালকদের জন্য মারাত্মক প্রাণঘাতী হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই সমস্ত যৌক্তিক সতর্কতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই সৌন্দর্যায়নের কাজ চালিয়ে যাওয়া হয়, যার খেসারত আজ সরাসরি ভোগ করতে হচ্ছে সাধারণ পথচারী ও চালকদের।

কংগ্রেস নেতা আশুতোষ চট্টোপাধ্যায় আরও অত্যন্ত ক্ষোভের সুরে বলেছেন যে এই সম্পূর্ণ বিষয়টি একটি অবাস্তব ও অপরিকল্পিত ধারণার ফল ছাড়া আর কিছুই নয়। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, অ্যাসফল্ট বা পিচ ঢালাই রাস্তার ওপর কখনোই তেল-ভিত্তিক বা অযোগ্য রং প্রয়োগ করা উচিত নয়, যা বেসিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নিয়মকেই সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করে। শহরের ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট সংস্কার করা এবং নিকাশি ব্যবস্থার স্থায়ী উন্নতির কাজ করার কথা থাকলেও প্রশাসন কেবল গাজোয়ারি কায়দায় রং করার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত রয়েছে বলে তিনি তীব্র তোপ দেগেছেন। আসন্ন উৎসবের মরশুমে তিলোত্তমার এই রঙিন রূপ সাধারণ মানুষের আনন্দকে মাটি করে বড় কোনো বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় কি না, সেটাই এখন শহরবাসীর কাছে সবচেয়ে বড় ভয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।




