INDIA Bloc Meets President Murmu: ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক, জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ চেয়ে স্মারকলিপি জমা বিরোধীদের
New Delhi: দেশজুড়ে চলা চরম রাজনৈতিক ডামাডোল এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা জালিয়াতির অভিযোগের মাঝেই এবার সরাসরি দেশের সাংবিধানিক প্রধানের দ্বারস্থ হলো বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA)। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে অপসারণ এবং দেশজুড়ে পরিকল্পিত ‘ভোটচুরি’-র মারাত্মক অভিযোগ নিয়ে শুক্রবার রাতে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন বিরোধী শিবিরের শীর্ষ নেতারা। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে চলা এই হাইভোল্টেজ বৈঠকের পর বেরিয়ে এসে যথেষ্ট আশাবাদী সুরেই কথা বলেছেন রাহুল গান্ধী থেকে শুরু করে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিরোধী জোটের নেতাদের দাবি, দেশের রাষ্ট্রপতি তাঁদের এই ভোটচুরির এবং নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগকে একেবারেই উড়িয়ে দেননি। বরং তিনি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে বিরোধীদের সমস্ত বক্তব্য শুনেছেন এবং অভিযোগের সপক্ষে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ চেয়ে পাঠিয়েছেন। শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তরে আয়োজিত বিরোধী জোটের বিশাল সমাবেশের ঠিক আগের দিন রাতে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে এই ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের বৈঠক জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
Parakiya Law in India: পরকীয়া কি আইনি, বেআইনি নাকি আইনি সিদ্ধ? জানুন সমাজজীবনে এর সুবিধা ও অসুবিধা
শুক্রবার রাত ৮টার সময় বিরোধীদের এই ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদলকে সাক্ষাতের সময় দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি। সেই নির্ধারিত সময়েই তাঁরা রাষ্ট্রপতি ভবনে পৌঁছন এবং রাত ৯টার কিছু আগে বৈঠক শেষে বাইরে বেরিয়ে আসেন। রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান যে, তাঁদের এই বৈঠক অত্যন্ত সদর্থক এবং ইতিবাচক হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা আজ রাষ্ট্রপতির কাছে আমাদের দাবিপত্র এবং স্মারকলিপি জমা দিয়েছি। আলোচনা চলাকালীন আমরা রাষ্ট্রপতির একটি অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব দেখতে পেয়েছি। উনি আমাদের কথা মন দিয়ে শুনে বলেছেন যে, তিনি গোটা বিষয়টা বিস্তারিত ভাবে খতিয়ে দেখবেন। তবে এই ধরনের অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য ওঁর প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে।” মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও জানান যে, রাষ্ট্রপতির নির্দেশমতো বিরোধীরা দ্রুত সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি এবং তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে রাষ্ট্রপতি ভবনে জমা করবেন। তৃণমূল নেত্রী এদিন আরও বলেন, “আমরা রাষ্ট্রপতিকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছি যে, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে গোটা দেশে এখন এক অত্যন্ত উদ্বেগের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। দেশের সংবিধানের রক্ষক এবং অভিভাবক হিসেবে ভারতের গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে আপনার উচিত যথাযথ এবং কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
![]()
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে হওয়া এই বৈঠককে এক অভাবনীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীও। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে কংগ্রেস নেতা জানান যে, তাঁরা তাঁদের স্মারকলিপিতে দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। রাহুলের কথায়, “আমরা আমাদের স্মারকলিপিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছি যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার যৌথভাবে ভারতের পবিত্র গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার জন্য এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন।” রাহুল গান্ধী আরও দাবি করেন যে, দেশের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি তাঁদের এই মারাত্মক অভিযোগ বা বক্তব্যগুলিকে কখনোই অস্বীকার বা খণ্ডন করার চেষ্টা করেননি। রাহুল বলেন, “আমরা যা যা বলেছি, রাষ্ট্রপতি তার সবটাই অত্যন্ত মন দিয়ে শুনেছেন। আমাদের কোনো বক্তব্যের পাল্টা কোনো যুক্তি তিনি দেননি, শুধু ভোটচুরির সপক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ আমাদের জমা করতে বলেছেন।” উল্লেখ্য, এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দলে মমতা এবং রাহুল ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি, সিপিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা, সমাজবাদী পার্টির শীর্ষ নেতা রাজীব রায়, এনসিপি (এসপি) নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে, জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা, আরজেডি সাংসদ মনোজ ঝা এবং ভিসিকে-র থোল তিরুমাভালাম।
অন্যদিকে, শুক্রবার রাতে যখন এই ১০ জন শীর্ষ নেতা রাষ্ট্রপতি ভবনের ভেতরে দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে বৈঠকে ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক সেই সময়ে বিজয় চকের রাস্তায় বসে প্রবল বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন বিরোধী জোটের বাকি সাংসদরা। পুলিশ তাঁদের মিছিল আটকে দেওয়ার ফলেই রাস্তায় বসে এই প্রতিবাদ শুরু হয়। এর আগে, শুক্রবার বিকেলের দিকে সংসদের সেন্ট্রাল হলে আগামী দিনের আন্দোলনের রূপরেখা এবং রণকৌশল চূড়ান্ত করতে একটি বিশেষ আলোচনায় বসেছিলেন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র সাংসদরা। দলীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, সেই অভ্যন্তরীণ আলোচনায় রাহুল গান্ধী দাবি করেন যে, গত কয়েকদিন ধরে বিরোধী দলগুলি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যে লাগাতার বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে, তা ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের ভিত পুরোপুরি নাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর মতে, শাসকগোষ্ঠী এখন এই প্রবল জনরোষ দেখে রীতিমতো ভীত এবং সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। উপস্থিত সমস্ত সাংসদদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে রাহুল বলেন, “আমাদের লড়াই শুধু নির্বাচন সদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জ্ঞানেশ কুমারের চেয়েও এই দুর্নীতির শিকড় আরও অনেক বেশি গভীরে প্রোথিত। আর ঠিক সেই কারণেই দেশের স্বার্থে বর্তমান এই অগণতান্ত্রিক সরকারের পতনের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের এই বর্তমান আন্দোলনের মূল সূত্রপাত হয়েছিল গত ২৩শে সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ সংবাদমাধ্যমের একটি চাঞ্চল্যকর অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে। ওই বিস্ফোরক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই প্রবল মতবিরোধ এবং অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী মারাত্মক অভিযোগ তুলেছিলেন যে, তাঁদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এবং মতামত না নিয়েই কমিশনের শীর্ষ স্তর থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নেওয়া হয়েছে। মূলত ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা রক্ষা, বেআইনি ভাবে ৬ নম্বর ফর্মের বয়ান বদল করা এবং এসআইআর (SIR) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার পর বহু বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া ও নতুন নাম যুক্ত করা সংক্রান্ত একাধিক বিষয় নিয়ে প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন সান্ধু এবং জোশী। জানা যায়, গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তাঁরা লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। এই চরম বিতর্কের মুখে পড়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশন ব্যাখ্যা দিয়েছিল যে, কমিশনারদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও শেষ পর্যন্ত ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু কমিশনের এই সাফাইয়ে বিতর্ক বিন্দুমাত্র থামেনি, বরং বিরোধী দলগুলি আরও বেশি করে সুর চড়িয়ে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছে। গত ৩০শে সেপ্টেম্বর দিল্লির বৈঠকে এই বিষয়ে সর্বাত্মক আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয় এবং শনিবার যন্তর মন্তরে সেই আন্দোলনের অঙ্গ হিসেবেই এক বিরাট সমাবেশের আয়োজন করেছে বিরোধী শিবির।




