Kanaipur Guru Molestation Case: কোন্নগরে শ্লীলতাহানির প্রতিবাদ করায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার প্রধান অভিযুক্ত ও আটক স্বঘোষিত গুরু
Hooghly: ধর্মীয় আড়ম্বর ও ভক্তির আড়ালে ঘটে চলা অপরাধের ঘটনা আবারও একবার সমাজের মুখোশ খুলে দিল। হুগলি জেলার কোন্নগরের কানাইপুর গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান্ট লাগোয়া কলোনি এলাকায় এক স্বঘোষিত গুরুর বিরুদ্ধে এক শিষ্যার শ্লীলতাহানি করার গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দারা দুটি পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়েন এবং তীব্র বচসা থেকে শুরু হওয়া হাতাহাতির এক পর্যায়ে ইটের আঘাতে নির্মমভাবে খুন হতে হয় এক ব্যক্তিকে। ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং শ্লীলতাহানির অভিযোগে অভিযুক্ত ওই স্বঘোষিত গুরুকে আটক করার পাশাপাশি খুনের অভিযোগে প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে। মানুষের অন্ধবিশ্বাস এবং ধর্মীয় ভণ্ডামির সুযোগ নিয়ে কীভাবে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এই মর্মান্তিক ঘটনাটি তার এক অন্যতম উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত বিবরণে জানা গিয়েছে যে হাবড়ার বাসিন্দা গোপালকৃষ্ণ গোস্বামী নিজেকে এক স্বঘোষিত গুরু হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় শিষ্য তৈরি করে বেড়ান। গত সোমবার তিনি হুগলির কোন্নগরের কানাইপুর এলাকায় তাঁর কয়েকজন শিষ্যের বাড়িতে আসেন এবং সেখানেই রাত কাটানোর জন্য ওঠেন। কিন্তু সেই রাতেই তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠে যে তিনি এক শিষ্যের স্ত্রীকে অত্যন্ত কুৎসিতভাবে স্পর্শ করেছেন এবং তাঁর শ্লীলতাহানি করেছেন। ওই মহিলা সাহসের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানান এবং অভিযোগ তোলেন যে এর আগেও ওই গুরুদেব অন্য বহু মহিলার সঙ্গে এ ধরনের অশালীন আচরণ করেছেন। কানাইপুরের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা জানাজানি হতেই মুহূর্তের মধ্যে কলোনি চত্বরে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং স্থানীয় মানুষজন ও শিষ্যদের মধ্যে তীব্র গোলমাল শুরু হয়ে যায়।
![]()
এই ঘটনার জেরে কানাইপুরের ওই কলোনির বাসিন্দারা দুটি স্পষ্ট শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েন। একদল মানুষ নির্যাতিতা মহিলার পক্ষ নিয়ে গুরুর কঠোর শাস্তির দাবি জানান, অন্যদিকে আর একটি দল অভিযুক্ত গুরুর সমর্থনে নানা সাফারি দিতে শুরু করে। দুই পক্ষের এই উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা ও চরম বচসার পরিবেশের মাঝেই হঠাৎ হাতাহাতি শুরু হয়। সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে গুরুর সমর্থনে থাকা এক ব্যক্তি অর্থাৎ গণেশ হালদার অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে সুকচাঁদ সমাদ্দার নামের এক ব্যক্তির মাথায় সজোরে ইটের বাড়ি মারে বলে অভিযোগ ওঠে। ইটের গুরুতর আঘাতে সুকচাঁদ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং তাঁর মাথা থেকে প্রচুর রক্তপাত হতে শুরু করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে পথেই বা হাসপাতালে পৌঁছানোর পর তাঁর মৃত্যু হয়।
একজন নিরীহ মানুষের এইভাবে মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই কানাইপুর এলাকায় তীব্র অসন্তোষ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং মৃত সুকচাঁদ সমাদ্দারের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। শ্লীলতাহানির মূল অভিযুক্ত স্বঘোষিত গুরু গোপালকৃষ্ণ গোস্বামীকে পুলিশ আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধারায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, সরাসরি সুকচাঁদের মাথায় ইটের বাড়ি মেরে খুন করার অপরাধে গণেশ হালদার নামের অভিযুক্তকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। এই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা পূর্ব পরিকল্পিত কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শুরু করেছে।

ধর্মীয় গুরুদের আড়ালে এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং তার জেরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। অন্ধবিশ্বাসের বশে সাধারণ মানুষ কীভাবে অন্ধভাবে ভণ্ড গুরুদের অন্ধ অনুসরণ করে এবং প্রতিবাদ করলেই জীবন দিতে হয়, তা এই কানাইপুরের ঘটনায় ফের প্রমাণিত হলো। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে যে এলাকায় যাতে নতুন করে কোনো আইন-শৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে, তার জন্য পর্যাপ্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। অভিযুক্ত গুরু এবং ধৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আদালতে পেশ করা হবে। নিরীহ সুকচাঁদের পরিবারের সদস্যদের কান্নায় ভেঙে পড়া এবং কানাইপুরের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গোটা হুগলি জুড়ে এখন তীব্র নিন্দার ঝড় বয়ে চলেছে।




