Kolkata Police Immersion Guidelines: চোরবাগান বিপর্যয়ের শিক্ষা! বিসর্জনের আগে কড়া নির্দেশিকা কলকাতা পুলিশের, ঘাট পরিদর্শনে মুখ্যমন্ত্রী
রিপোর্ট: তানিয়া ঘোষ
Kolkata: দশমীর দুপুর থেকেই গঙ্গার বিভিন্ন ঘাটে শুরু হতে চলেছে প্রতিমা নিরঞ্জনের পালা, আর এই বিসর্জন পর্ব যাতে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও শৃঙ্খলিতভাবে সম্পন্ন হয়, তার জন্য একগুচ্ছ কড়া নির্দেশিকা জারি করেছে কলকাতা পুলিশ। সাম্প্রতিক সময়ে চোরবাগান সর্বজনীন পুজো মণ্ডপে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক পদপিষ্টের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রশাসন এবার সামান্যতম ঝুঁকিও নিতে নারাজ। এই প্রেক্ষাপটে বিসর্জনের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ঘাটগুলির প্রস্তুতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সকাল সকাল বাবুঘাট, কদমতলা ঘাট এবং জাজেস ঘাট পরিদর্শন করেছেন। প্রশাসনিক এই আকস্মিক ও কঠোর পদক্ষেপে উৎসবের শেষলগ্নে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার বিষয়টি যে সরকারের কাছে সর্বাগ্রে রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
সকালবেলা ঘাট পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত সতর্কবার্তার সুরে বলেন যে রাজ্য সরকার এবার অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে, কারণ সামান্য কয়েক মুহূর্তের অসতর্কতা বা ত্রুটির ফলেই বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে। চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তিনি মন্তব্য করেন যে মাত্র দু’মিনিটের ভুলের জন্যই সেখানে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছিল, তাই বিসর্জনের ক্ষেত্রে প্রশাসন কোনো রকম ফাঁকফোকর রাখতে চাইছে না। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই প্রথমবার কলকাতা পুলিশ ও রাজ্য প্রশাসনের পাশাপাশি জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা এনডিআরএফ (NDRF)-কে ময়দানে নামানো হয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত এই দক্ষ বাহিনীর পাশাপাশি বিএসএফের ৭ জন সদস্য, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তর এবং কলকাতা পুরসভা একে অপরের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় রেখে কাজ করবে।

নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলতে কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষ এবং পুজো কমিটিগুলির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘Do’s and Don’ts’ বা পালনীয় নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। এই নির্দেশিকায় সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে বিসর্জন শোভাযাত্রায় ডিজে (DJ) সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে এবং লাউডস্পিকার বা মাইকিংয়ের ক্ষেত্রে শব্দের মাত্রা নির্ধারিত সীমার মধ্যেই রাখতে হবে। ঘাট চত্বরে পুলিশের নির্দেশ ও নির্দিষ্ট রুট ম্যাপ মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, এবং কোনোভাবেই ঘাটে অযথা ভিড় জমানো বা জটলা পাকানো যাবে না। এর পাশাপাশি বিসর্জনের দিন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ঘাট চত্বরে প্রবেশ করার ওপর অত্যন্ত কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে কলকাতা পুলিশ, এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
চোরবাগানের সেই অভিশপ্ত ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের বিষয়েও মুখ্যমন্ত্রী জোরালো মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান যে ঘটনার নিখুঁত কারণ খতিয়ে দেখতে হাইকোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং টিম গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের এই ধরনের মর্মান্তিক মৃত্যু কোনোভাবেই ক্ষমাযোগ্য নয় উল্লেখ করে তিনি হুংকার দিয়েছেন যে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান শেষে যারাই এই গাফিলতির জন্য দায়ী থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিসর্জনের পুরো পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখতে একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী এবং বারাসত রেঞ্জের ডিআইজি-কে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়।

সব মিলিয়ে, চোরবাগানের ট্র্যাজেডির পর রাজ্যের প্রশাসনিক মহলে যে কঠোর ও অনমনীয় মনোভাব তৈরি হয়েছে, বিসর্জনের এই নির্দেশিকা ও তৎপরতা তারই এক স্পষ্ট প্রমাণ। আনন্দের উৎসবের সমাপ্তি পর্ব যেন কোনোভাবেই বিষাদে পর্যবসিত না হয়, তার জন্য পুলিশ প্রশাসন এবং সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রতিটি পদক্ষেপে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখছেন। সাধারণ মানুষ ও পুজো কমিটিগুলি যদি এই নিয়ম ও নির্দেশিকাগুলি নিষ্ঠাভাবে মেনে চলেন, তবেই একটি শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ প্রতিমা নিরঞ্জন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। আগামী দিনে এই প্রশাসনিক কড়াকড়ি উৎসবের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কতটা সফল হয়, এখন সেটাই দেখার প্রধান বিষয়।




