Malda Zilla Parishad BJP: সোমবার রাতে পুলিশের সঙ্গে কংগ্রেস সাংসদের তুমুল বচসা, মঙ্গলবার কড়া নিরাপত্তায় গঠিত হলো বোর্ড
Malda: মাত্র ৫ মাসের ব্যবধানে রাজ্যের জেলা পরিষদ দখলের ক্ষেত্রে শাসক দল বিজেপির হ্যাটট্রিক সম্পন্ন হলো। পূর্ব মেদিনীপুর এবং নদিয়া জেলার পর এবার উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মালদহ জেলা পরিষদও নিজেদের দখলে নিয়ে নিল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি। আর সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, মালদহে বিজেপিকে এই বোর্ড গড়তে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করেছেন মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচিত সদস্যরা। রাজনৈতিক মহলের মতে, ঠিক যে কায়দায় নদিয়া জেলা পরিষদে শাসক দল ক্ষমতা দখল করেছিল, সেই একই ‘নদিয়া ফর্মুলা’ এবার মালদহেও সাফল্যের সঙ্গে প্রয়োগ করা হলো। মমতা শিবিরের ৬ জন সদস্যের সমর্থন পাওয়ায় মালদহ জেলা পরিষদের নতুন সভাধিপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বিজেপির দীপালি বালা এবং সহ-সভাধিপতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদটি পেয়েছেন মমতা তৃণমূলের নেত্রী লিপিকা ঘোষ। এই অভাবনীয় রাজনৈতিক সমীকরণ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে এই মুহূর্তে প্রবল তোলপাড় শুরু হয়েছে।

মালদহ জেলা পরিষদের এই নতুন বোর্ড গঠনকে কেন্দ্র করে গত সোমবার গভীর রাত থেকেই এলাকায় প্রবল রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং গোলমাল বাঁধতে শুরু করেছিল। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে যে, জেলা পরিষদের অন্তত ৩ জন সদস্য কংগ্রেস দলকে সমর্থন দেবেন বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁরা এলাকার কংগ্রেস সাংসদ ইশা খান চৌধুরী এবং প্রাক্তন সাংসদ মৌসম বেনজির নূরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে তাঁদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন। ওই ৩ সদস্যের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাংসদ ইশা খান চৌধুরী নিজে উদ্যোগী হয়ে তাঁদের নিয়ে সোমবার রাতে মালদহে ফিরছিলেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে, মালদহ স্টেশনে ট্রেন থেকে নামার পরই ওই ৩ জনকে আটকে দেয় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোমবার রাতেই পুলিশের সঙ্গে কংগ্রেস সাংসদের তুমুল বচসা বাঁধে। কংগ্রেস নেতৃত্বের তরফ থেকে তীব্র অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, বিরোধী সদস্যদের এভাবেই জোর করে আটকে রেখে পুলিশ প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদতেই বিজেপি মালদহে বোর্ড গড়েছে।

মালদহ জেলা পরিষদে মোট নির্বাচিত আসনের সংখ্যা হলো ৪৩টি। এই পরিষদে এককভাবে সভাধিপতি ও সহ-সভাধিপতি গঠন করে বোর্ড দখল করার জন্য ম্যাজিক ফিগার বা ন্যূনতম ২২ জন সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন ছিল। মঙ্গলবার মমতা তৃণমূল কংগ্রেসের মোট ৬ জন সদস্য প্রকাশ্যে বিজেপিকে সমর্থন করায় শাসক দল অনায়াসেই সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে নেয়। এই দিন বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া পাহারায় এবং উপস্থিতিতে জেলা পরিষদের নতুন বোর্ড গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের বিজেপি প্রতিমন্ত্রী জোয়েল মুর্মু, বিজেপি বিধায়ক তথা বিধানসভার মুখ্য সচেতক অম্লান ভাদুড়ি, দক্ষিণ মালদহ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায় এবং উত্তর মালদহের সভাপতি প্রতাপ সিং-এর মতো শীর্ষ স্থানীয় নেতারা। তাঁদের সকলের উপস্থিতিতেই সর্বসম্মতিক্রমে দীপালি বালাকে সভাধিপতি এবং লিপিকা ঘোষকে সহ-সভাধিপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
![]()
তবে সর্বভারতীয় স্তরে যে দল বিজেপির সবচেয়ে কট্টর বিরোধী বলে নিজেদের দাবি করে, সেই মমতা তৃণমূল কেন আচমকা মালদহ জেলা পরিষদে শাসক দলকে এমন নিঃশর্ত সমর্থন দিল, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিরাট প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে বিরোধী দল সিপিএম। বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ তীব্র কটাক্ষ করে প্রশ্ন তুলেছেন, “যাঁরা ভোট চোর বলে নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চেয়ে দিল্লিতে মেগা মিছিল করছেন, তাঁদেরই দলের একাংশ স্থানীয় স্তরে সেই বিজেপির সঙ্গেই অনায়াসে হাত মেলাচ্ছে। এই দ্বিমুখী দৃশ্যটা অবিলম্বে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডেকে দেখানো হোক এবং তাঁর কাছে এর জবাব চাওয়া হোক।” অন্যদিকে, বিজেপিকে সমর্থন জানানো মমতা তৃণমূলের ১ সদস্য এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, “আমার ইচ্ছে হলো, তাই আমি সমর্থন দিয়েছি।” এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলের জল্পনা আরও কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে।

মালদহ জেলা পরিষদের এই নাটকীয় পালাবদল এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে ঠিক কী সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখন থেকেই বিস্তর আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে। একদিকে যখন বিরোধীরা পুলিশ এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে জোর করে ক্ষমতা দখলের অভিযোগ তুলছেন, ঠিক তখন শাসক দল বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্বের দাবি, সাধারণ মানুষ এবং খোদ বিরোধী দলের সদস্যরাও তৃণমূলের দীর্ঘদিনের অপশাসনে বীতশ্রদ্ধ হয়েই উন্নয়নের স্বার্থে আজ বিজেপিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমর্থন করছেন। দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের মেগা লড়াইয়ের আবহে মালদহের মাটিতে মমতা শিবির এবং বিজেপির এই অঘোষিত জোট কংগ্রেস এবং বামেদের কাছে যে ১টি বড়সড় রাজনৈতিক ধাক্কা, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আগামী দিনগুলোতে এই ‘নদিয়া ফর্মুলা’ রাজ্যের আরও অন্যান্য জেলা পরিষদেও দেখা যায় কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় দেখার বিষয় এবং রাজ্য রাজনীতির অন্যতম চর্চার কেন্দ্রবিন্দু।




