Milan Pradhan: ‘কংগ্রেস প্রার্থীকে ভোটে লড়তে দিন’, নন্দীগ্রামে মিলন প্রধানকে নিয়ে রাজ্যকে কড়া নির্দেশ হাইকোর্টের
KOLKATA: Milan Pradhan বা নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেসের দাপুটে প্রার্থী মিলন প্রধানকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে এবার এক নতুন এবং নাটকীয় মোড় এল। ভোটের মুখে তাঁকে পুরোনো মামলায় ফাঁসিয়ে জেলে আটকে রাখার যে গুরুতর অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে উঠেছিল, এবার সেই বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করল কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court)। সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিতে হাইকোর্টের বিচারপতি রাজ্য সরকারকে মৌখিকভাবে অত্যন্ত কড়া ভাষায় নির্দেশ দিয়েছেন যে, কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে কোনোভাবেই নন্দীগ্রামের আসন্ন উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে আটকানো যাবে না। একটি গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী দলের প্রার্থীকে জোরপূর্বক আটকে রেখে একতরফা ভোট করানো যে কোনোভাবেই কাম্য নয়, তা আদালতের এই কড়া পর্যবেক্ষণে আবারও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে। হাইকোর্টের এই নির্দেশের ফলে একদিকে যেমন কংগ্রেস শিবিরে খুশির হাওয়া বইছে, তেমনই নির্বাচনের ঠিক মুখে রাজ্য পুলিশ প্রশাসন এবং শাসকদল বড়সড় আইনি ধাক্কা খেল বলে মনে করছে রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল।

নন্দীগ্রাম বরাবরই বাংলার রাজনীতির অন্যতম প্রধান ভরকেন্দ্র, আর এবারের উপনির্বাচনে সেখানে রাজনৈতিক উত্তাপ যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। মিলন প্রধান ওই এলাকার দীর্ঘদিনের একনিষ্ঠ কংগ্রেস নেতা এবং এই উপনির্বাচনে তিনি শাসকদলের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবেন বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই ভোটের ঠিক আগে রাজ্য পুলিশ তাঁকে একটি পুরোনো মামলার কারণ দেখিয়ে গ্রেপ্তার করে। প্রদেশ কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে, বিরোধীদের শূন্য করার যে চক্রান্ত শাসকদল করেছে, এটি তারই একটি সুস্পষ্ট অংশ। জেনেশুনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্যই মিলন প্রধানকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জেলে ঢোকানো হয়েছে, যাতে তিনি কোনোভাবেই ভোটের প্রচারে অংশ নিতে না পারেন এবং শাসকদলের জয় নিশ্চিত হয়। পুলিশের এই বিতর্কিত গ্রেপ্তারির সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেই কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল কংগ্রেস নেতৃত্ব, যার প্রেক্ষিতেই এবার আদালতের এই মেগা নির্দেশ সামনে এল এবং রাজ্য প্রশাসনের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি হলো।
শুনানিপর্বে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি পুলিশের এই অতি-সক্রিয়তা নিয়ে রীতিমতো উষ্মা প্রকাশ করেন। মিলন প্রধানকে যেভাবে নির্বাচনের মুখে তড়িঘড়ি গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তার আসল যৌক্তিকতা নিয়ে ভরা এজলাসে প্রশ্ন তোলে আদালত। বিচারপতির মৌখিক পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে বলা হয় যে, নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী দেশের যেকোনো নাগরিকের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে, যদি না তাঁর বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত আইনি নিষেধাজ্ঞা বা সাজা ঘোষণা হয়ে থাকে। তাই স্রেফ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো প্রার্থীকে জেলে আটকে রেখে ভোটের ময়দান থেকে দূরে সরিয়ে রাখা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চরম পরিপন্থী। আদালত রাজ্য সরকারকে কড়া বার্তা দিয়ে জানিয়েছে যে, মিলন প্রধান যাতে নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজের মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারেন, তা পুলিশ প্রশাসনকেই সুনিশ্চিত করতে হবে। এই নির্দেশের ফলে পুলিশ এখন মিলন প্রধানের নির্বাচনী প্রচারের পথে আর কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না।

হাইকোর্টের এই মেগা রায় ঘোষণার পরপরই রাজ্য কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা একে সত্যের জয় এবং শাসকদলের গালে এক বিরাট আইনি চড় বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, শাসকদল খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে যে নন্দীগ্রামে এবার তাদের পায়ের তলার মাটি আগের থেকে অনেকটাই আলগা হয়ে গিয়েছে, আর সেই ভয় থেকেই পুলিশকে লেলিয়ে দিয়ে বিরোধী প্রার্থীদের ভয় দেখানোর ঘৃণ্য চেষ্টা হচ্ছে। কংগ্রেস নেতৃত্বের দাবি, মিলন প্রধানের এই গ্রেপ্তারি আসলে শাসকদলের রাজনৈতিক দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের আইনজীবীরা আদালতে পুলিশের পদক্ষেপের পক্ষে সওয়াল করার চেষ্টা করলেও, বিচারপতির কড়া প্রশ্নের মুখে তাঁরা কার্যত নিরুত্তর হয়ে পড়েন। রাজনৈতিক মহলের মতে, কলকাতা হাইকোর্টের এই নির্দেশের ফলে মিলন প্রধান নন্দীগ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে এখন একজন ‘সহানুভূতি’ বা সিমপ্যাথি ভোটের অন্যতম বড় দাবিদার হয়ে উঠতে পারেন, যা আগামী দিনে শাসকদলের ভোটব্যাঙ্কে বড়সড় ফাটল ধরাতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার একেবারে তুঙ্গে উঠবে। এখন দেখার বিষয়, কলকাতা হাইকোর্টের এই সুস্পষ্ট নির্দেশিকার পর রাজ্য পুলিশ প্রশাসন মিলন প্রধানের মুক্তির বিষয়ে বা তাঁর ভোটের লড়াইয়ের ক্ষেত্রে কত দ্রুত সদর্থক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। মিলন প্রধান যদি পূর্ণ উদ্যমে নিজের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে প্রচারে নামতে পারেন, তবে নন্দীগ্রামের মেগা ভোটযুদ্ধ যে একতরফা হবে না, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজ্যের বর্তমান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী থেকে শুরু করে শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্ব—সবাই এখন নন্দীগ্রামের দিকেই তীক্ষ্ণ নজর রেখেছেন। এই হাই-ভোল্টেজ উপনির্বাচনে সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত কাকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নেন, তার উত্তর পেতে ভোটের দিন পর্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেই হবে। তবে আপাতত কলকাতা হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে মিলন প্রধান যে এক বড়সড় আইনি জয় হাসিল করলেন, তা বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবেই লিপিবদ্ধ হয়ে রইল।




