Vladimir Putin: রাশিয়ার নির্বাচনে জয়ী পুতিন! ‘ভুয়ো নির্বাচন’ বলে তোপ দাগল ইউরোপ ও পশ্চিমী দেশগুলি
MOSCOW: Vladimir Putin বা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের রাজনৈতিক দল ‘ইউনাইটেড রাশিয়া’ দেশটির সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পুনরায় নিজেদের আধিপত্য কায়েম করেছে। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এই নির্বাচনী ফলাফলকে পুতিনের যুদ্ধনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের প্রতি রুশ জনগণের অকুন্ঠ সমর্থনের সুস্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে নির্বাচনের এই অভাবনীয় ফলাফল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তীব্র বিতর্কের ঝড় তুলেছে। মস্কোর দাবি অনুযায়ী, সাধারণ রাশিয়ানরা পুতিনের নেতৃত্বে সম্পূর্ণ আস্থা রেখেছেন এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান বিশেষ সামরিক অভিযানকে ব্যাপকভাবে সমর্থন করছেন। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানী ও স্বাধীন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ এই দাবির সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করছেন। তাঁদের মতে, রাশিয়ার মাটিতে যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং অবিলম্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনী জয়কে অস্ত্র করে পুতিন আগামী দিনে নিজের একনায়কতন্ত্রকে আরও জোরদার করতে চাইছেন বলেই আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো আশঙ্কা।

আন্তর্জাতিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টার’-এর বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক তাতায়ানা স্ট্যানোভায়া এক অনলাইন বিশ্লেষণে জানিয়েছেন যে, পুতিন নিশ্চিতভাবেই ইউনাইটেড রাশিয়ার এই বিপুল জয়কে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রতি রুশ জনতার অবাধ সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এর ঠিক সম্পূর্ণ বিপরীত। রাশিয়ার জনসাধারণের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ক্লান্তি এবং যুদ্ধ বন্ধ করার দাবি দিন দিন অত্যন্ত প্রবল হয়ে উঠছে। স্ট্যানোভায়ার মতে, এই নির্বাচনের পর সবচেয়ে বড় এবং উদ্বেগের প্রশ্ন হলো—পুতিন এখন কী পদক্ষেপ নেবেন? আন্তর্জাতিক মহলের গভীর আশঙ্কা, এই তথাকথিত বিপুল জয়ের অজুহাতে ক্রেমলিন খুব শীঘ্রই রাশিয়ায় নতুন করে সামরিক বাধ্যতামূলক সেনাবহর বা দ্বিতীয় দফার ব্যাপক মবিলাইজেশন (Mobilisation) শুরু করতে পারে। এর পাশাপাশি দেশের ভেতরের বিরোধী স্বরগুলিকে চিরতরে স্তব্ধ করতে নতুন রাজনৈতিক দমনপীড়ন, কালাকানুন প্রয়োগ এবং ইউক্রেন সীমান্তে যুদ্ধের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
রাশিয়ার এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) অত্যন্ত কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং এটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন একটি প্রহসন হিসেবে খারিজ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক তথা পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান কাজা ক্যালাস অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই তথাকথিত নির্বাচনকে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট অভিযোগ করেন যে, ক্রেমলিন দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দিয়েছে। নির্বাচনের আগে সমস্ত ভিন্নমত ও স্বাধীন কণ্ঠস্বরকে সম্পূর্ণভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করছিল যে একমাত্র নিবন্ধিত বিরোধী রাজনৈতিক দল, তাদেরও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেওয়া হয়নি এবং জোরপূর্বক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি কোনো আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলকে রাশিয়ার নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর নজরদারি চালাতে দেওয়া হয়নি। ক্যালাসের মতে, রাশিয়ায় আজ গণতন্ত্রের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব অবশিষ্ট নেই, যা আছে তা কেবল একটি বহিরাবরণ বা মুখোশ মাত্র।

রাশিয়ার এই নির্বাচন নিয়ে শুধুমাত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নই নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চের অন্যান্য প্রথম সারির পশ্চিমী শক্তিগুলিও একযোগে কড়া অবস্থান গ্রহণ করেছে। ব্রিটেন, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া সহ পাঁচটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশ একটি কড়া যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে রাশিয়ার এই নির্বাচনকে কঠোর ভাষায় ধিক্কার জানিয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেনের যে সমস্ত অঞ্চল বা ভূখণ্ড রাশিয়া জোরপূর্বক ও অবৈধভাবে সামরিক শক্তির জোরে দখল করে রেখেছে, সেই সমস্ত অধিকৃত এলাকায় ভোটগ্রহণের তীব্র বিরোধিতা করেছে এই দেশগুলি। পশ্চিমী জোটের যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চলে এই তথাকথিত সংসদীয় নির্বাচন পরিচালনা করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং তা আন্তর্জাতিক সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত সমস্ত আইনের চরম লঙ্ঘন। তারা জানিয়েছে, এই ভুয়ো নির্বাচন আসলে ইউক্রেনের স্বাধীন জমিকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্থায়ী করার একটি বৃহত্তর অবৈধ দখলদারিত্ব ব্যবস্থার অংশ মাত্র, যা কোনো স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশ কখনোই স্বীকৃতি দেবে না।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমী দেশগুলির এই সম্মিলিত আক্রমণ ও বয়কট পুতিন প্রশাসনের কূটনৈতিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলতে চলেছে। রাশিয়ার অর্থনীতি ইতিমধ্যেই ব্যাপক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে ধুঁকছে, আর এই ভুয়ো নির্বাচনের ফলে মস্কোর সঙ্গে পশ্চিমের সম্পর্ক আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকল। তবে ক্রেমলিন এই সমস্ত আন্তর্জাতিক সমালোচনাকে একতরফা ‘পশ্চিমী প্ররোচনা’ আখ্যা দিয়ে নিজেদের আগ্রাসী অবস্থান থেকে পিছু হটতে সম্পূর্ণ নারাজ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ঘরে বাইরে চাপের মুখে পড়ে পুতিন আগামী দিনে আরও বেশি মরিয়া হয়ে উঠতে পারেন এবং ইউক্রেন যুদ্ধে বিধ্বংসী অস্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে পারেন। ফলে রাশিয়ার এই সাজানো নির্বাচন বিশ্বশান্তির জন্য এক নতুন অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা করল বলেই মনে করা হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে, পুতিনের এই তথাকথিত নির্বাচনী জয় রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক সংকটকে যেমন প্রকট করেছে, তেমনই ইউক্রেন সংঘাতকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।




