Milan Pradhan: রক্ষাকবচ খারিজ করে সিঙ্গল বেঞ্চকে তুলোধোনা প্রধান বিচারপতির! বিপাকে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান
KOLKATA: Milan Pradhan বা নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের অস্বস্তি এবং আইনি জটিলতা এবার আক্ষরিক অর্থেই বহুগুণ বেড়ে গেল। রাজ্যের আবেদনে সাড়া দিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ কংগ্রেস প্রার্থীর রক্ষাকবচ সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে। তবে শুধুমাত্র ওই নির্দেশিকা বা রক্ষাকবচ খারিজ করেই এদিন থেমে থাকেনি শীর্ষ আদালত। এজলাসের ভেতরে এক বেনজির এবং নজিরবিহীন দৃশ্যের অবতারণা ঘটিয়ে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের সিঙ্গল বেঞ্চকে রীতিমতো তুলোধোনা করেছেন প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র বি ঘুগে। সিঙ্গল বেঞ্চের দেওয়া ওই নির্দেশিকায় প্রবল বিস্ময় প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি ভরা এজলাসে অত্যন্ত ক্ষোভের সুরে প্রশ্ন তোলেন যে, ঠিক কোন আইনের বলে একজন অভিযুক্তকে এভাবে রক্ষাকবচ দেওয়া হলো? হাই কোর্টের এই কড়া পদক্ষেপ এবং প্রধান বিচারপতির এমন রুদ্রমূর্তির ফলে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের ঠিক আগে কংগ্রেস প্রার্থীর আইনি লড়াই যে এক বিরাট বড়সড় ধাক্কা খেল, তা বলাই বাহুল্য। রাজ্যের রাজনৈতিক মহলেও আদালতের এই পর্যবেক্ষণ নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।

এই আইনি বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল বেশ কয়েকদিন আগে, যার নেপথ্যে রয়েছে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। গত ১৫ সেপ্টেম্বর নন্দীগ্রামের হাই-ভোল্টেজ উপনির্বাচনের কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে মিলন প্রধান ঘটা করে নিজের মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক সমীকরণ আরও কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে ওঠে যখন গত ১৮ সেপ্টেম্বর খোদ তৃণমূল নেত্রী নিজে তাঁকে প্রকাশ্যে সমর্থন করার কথা ঘোষণা করেন। কিন্তু এই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জল বেশিদূর গড়ানোর আগেই পুলিশের তরফ থেকে এক অভাবনীয় এবং বড়সড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ওই দিনই কিছুক্ষণের মধ্যে ২০০৭ সালের একটি অত্যন্ত পুরনো এবং বিতর্কিত মামলায় তাঁকে পুলিশের তরফ থেকে আইনি হেফাজতে নেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের পুরনো এই মামলায় আচমকা পুলিশের এহেন পদক্ষেপ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। এরপরই নিজের আইনি অধিকার রক্ষার্থে তিনি কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন, যেখানে প্রথমে কিছুটা স্বস্তি পেলেও শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত অস্বস্তির মুখে পড়তে হলো এই রাজনৈতিক নেতাকে।
আরও পড়ুন: Umesh Rai: আইএএস অফিসারের পারিবারিক বিবাদে বিজেপি নেতার দাদাগিরি! ভাইরাল ভিডিও ঘিরে শোরগোল
গত বৃহস্পতিবার এই হাই-প্রোফাইল মামলার শুনানিতে সিঙ্গল বেঞ্চের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য কংগ্রেস প্রার্থীর পক্ষে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করেছিলেন। তিনি তাঁর নির্দেশে স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন যে, কংগ্রেস প্রার্থীকে পুলিশের খাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে ওই পুরনো মামলায় নতুন করে অভিযুক্ত হিসেবে দেখানো যাবে না এবং পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে কোনও রকম কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে না। সিঙ্গল বেঞ্চের দেওয়া এই নির্দেশকে আইনিভাবে চ্যালেঞ্জ করেই এরপর দ্রুত ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হয় রাজ্য সরকার। সেই মামলার শুনানিতেই এদিন প্রধান বিচারপতি কংগ্রেস প্রার্থীর আইনজীবী অয়ন ভট্টাচার্যের কাছে সরাসরি জানতে চান যে, কেন তাঁরা নিয়ম মেনে আগাম জামিনের আবেদন করেননি কিংবা পুলিশের হেফাজতে যাওয়ার পরেও কেন নিম্ন আদালতে জামিন চাওয়া হয়নি। সিঙ্গল বেঞ্চের ওই নির্দেশ যে আইনি দিক থেকে বেশ চমকপ্রদ এবং ব্যতিক্রমী ছিল, তা প্রধান বিচারপতির একাধিক প্রশ্নেই অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে যায়।

ভরা এজলাসে প্রধান বিচারপতির প্রশ্নের উত্তরে কংগ্রেস প্রার্থীর আইনজীবী অয়ন ভট্টাচার্য সওয়াল করেন যে, সামনেই নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন রয়েছে এবং একজন প্রার্থী হিসেবে তাঁর মক্কেলের হাতে আর বেশি সময় অবশিষ্ট নেই। মূলত সেই নির্বাচনী প্রচার এবং ব্যস্ততার কারণ দেখিয়েই আদালতে তড়িঘড়ি রক্ষাকবচ চাওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। আইনজীবীর এই সওয়াল শোনার পর প্রধান বিচারপতি অত্যন্ত কড়া ভাষায় নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি জানান যে, আইনজীবীর সওয়াল জবাব শুনে তিনি যতটুকু বুঝতে পারছেন, তাতে এটি সাধারণ জামিনের জন্য একটি উপযুক্ত মামলা এবং তাঁদের আইনি নিয়ম মেনে সেই পথেই হাঁটা উচিত ছিল। ভোটের জন্য এখনও যথেষ্ট সময় রয়েছে এবং প্রয়োজনে বিচারপ্রার্থীদের স্বার্থে শনি কিংবা রবিবার ছুটির দিনেও আদালতের বিশেষ শুনানি হতে পারে বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। এই প্রসঙ্গেই তিনি বম্বে হাই কোর্টে থাকাকালীন ১৫ আগস্টের ছুটির দিনেও একজন ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়ের জরুরি আর্জিতে আদালত বসানোর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ টেনে আনেন।
প্রধান বিচারপতির মতে, একজন রাজনৈতিক দলের কংগ্রেস প্রার্থী বলে তিনি কখনোই দেশের আইনের ঊর্ধ্বে উঠে যেতে পারেন না। কিংবা আইনকে পাশ কাটিয়ে তিনি নিজের ইচ্ছেমতো কোনও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেন না। কারণ, দেশের আইনের চোখে একজন ভিআইপি নেতা কিংবা সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনও তফাত নেই, সংবিধানের দৃষ্টিতে সবাই সমান। ভরা এজলাসে অত্যন্ত কড়া বার্তা দিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, “আপনি ভগবান নন। প্রত্যেকের আইনের প্রতি বিশ্বাস রয়েছে। আপনি কেউ নন। আইন মেনে জামিনের আবেদন করুন। আইন যা বলবে, সেই অনুযায়ী চলতে হবে।” তিনি আরও স্পষ্ট করে দেন যে, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়ার কোনও সরাসরি বিরোধ থাকতে পারে না। প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের এই মেগা নির্দেশের ফলে নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থীর ওপর যে এখন আইনি ও মানসিক চাপ মারাত্মকভাবে বেড়ে গেল, সেই বিষয়ে আর কোনও সন্দেহ নেই। আগামী দিনে তিনি কোন আইনি পথে হাঁটেন, সেদিকেই নজর ওয়াকিবহাল মহলের।




