Milan Pradhan: ‘অন্তর্বর্তী জামিন দিচ্ছি’, কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে লড়তে দেওয়ার নির্দেশ বিচারপতির! নজর শুক্রবারের শুনানিতে
KOLKATA: Milan Pradhan বা নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের গ্রেফতারি এবং তাঁর জামিনের মামলা ঘিরে বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টে এক নজিরবিহীন নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হলো। ১৯ বছরের একটি পুরনো মামলায় উপনির্বাচনের ঠিক মুখে তাঁকে গ্রেফতার করার পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র শোরগোল চলছে। বৃহস্পতিবার বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের এজলাসে এই মামলার শুনানিতে কংগ্রেস প্রার্থীর জামিন নিয়ে বিচারপতির একটি তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ গোটা রাজনৈতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এজলাসে বসে বিচারপতি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমি অন্তর্বর্তী জামিন দিচ্ছি। তিনি নির্বাচনে অংশ নিন। বাকিটা মামলার ভাগ্যের উপর নির্ভর করবে।” তবে এই পর্যবেক্ষণের পরেও কংগ্রেস প্রার্থীর জেলের বাইরে আসা এখনই পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। কারণ, এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে শুক্রবার বিকেল ৪টেয়। একই সঙ্গে রাজ্য সরকারও পাল্টা আইনি পথে হাঁটায় শুক্রবারের জোড়া শুনানির ওপরই নির্ভর করছে মিলন প্রধানের ভাগ্য।

ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার, যখন পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুর এলাকা থেকে আচমকাই পুলিশ মিলন প্রধানকে গ্রেফতার করে। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়, তাঁর বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনের সময়কার একটি পুরনো মামলা নতুন করে সক্রিয় করা হয়েছে। সেই সময়কার অশান্তির প্রেক্ষিতে নন্দীগ্রাম থানায় তিনটি এবং খেজুরি থানায় একটি মামলা রুজু করা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে খুন, খুনের চেষ্টা, লোকজন নিয়ে বেআইনি জমায়েত এবং লুটপাটের মতো একাধিক মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে। আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। আর ঠিক তার আগে, দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে পড়ে থাকা একটি পুরনো মামলায় খোদ প্রার্থীকে এমন নাটকীয়ভাবে গ্রেফতার করায় পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা। কংগ্রেস শিবিরের তরফ থেকে প্রথম থেকেই অভিযোগ করা হচ্ছে যে, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতেই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রার্থী গ্রেফতার হওয়ার পর বুধবার দ্রুত জামিন চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন মিলন প্রধান। তাঁর আইনজীবীরা বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের এজলাসে জামিনের আবেদন জানিয়ে বলেন যে, মিলন একজন উপনির্বাচনের প্রার্থী এবং জামিনের আবেদনের সাধারণ পদ্ধতিতে শুনানি করতে অনেকটা সময় লেগে যাবে। তাই আদালত যেন মামলা দায়েরের বিশেষ অনুমতি দেয় এবং দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করে। আইনজীবীদের এই বক্তব্য শোনার পর জামিনের মামলা দায়েরের অনুমতি দেন বিচারপতি ঘোষ। এরপর বৃহস্পতিবার শুনানিপর্বে বিচারপতি জানান যে, আসন্ন উপনির্বাচনে মিলনকে লড়াই করতে দেওয়া হোক এবং তিনি অন্তর্বর্তী জামিন দেবেন। তবে বিচারপতির এই “জামিন দিচ্ছি” মন্তব্যের পাশাপাশি তিনি শুক্রবার বিকেল ৪টেয় মামলার পরবর্তী শুনানি ধার্য করায় আইনি প্রক্রিয়াটি এখনও চূড়ান্ত পরিণতি পায়নি। তাই আনুষ্ঠানিক নির্দেশের জন্য শুক্রবারের শুনানির দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন কংগ্রেস প্রার্থীর অনুগামীরা।

এর পাশাপাশি, মিলন প্রধানের বিরুদ্ধে ঝুলে থাকা আরও পাঁচটি মামলায় রক্ষাকবচ চেয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চেও আবেদন করা হয়েছিল। সেই শুনানিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হয় রাজ্য সরকারকে। বিচারপতি সরাসরি রাজ্যের উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন, ২০২১ সালে জারি হওয়া একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করতে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত তদন্তকারী আধিকারিকেরা ঠিক কী করছিলেন? জবাবে রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল দাবি করেন যে, আগের সরকার এই মামলাগুলি প্রত্যাহার করতে চেয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মেনেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। রাজ্যের এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট না হয়ে আদালত জানায়, কংগ্রেস প্রার্থী ইতিমধ্যেই চারটি মামলায় জামিনের আবেদন করেছেন। তাই বাকি ছ’টি মামলায় আপাতত কোনো কড়া পদক্ষেপ না করাই রাজ্যের উচিত। এর প্রেক্ষিতে আদালত নির্দেশ দেয় যে, আগামী ১২ অক্টোবর পর্যন্ত নতুন মামলায় মিলনের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো পদক্ষেপ করতে পারবে না বা তাঁকে গ্রেফতার দেখাতে পারবে না।
হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চের এই জোড়া নির্দেশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা ঘুঁটি সাজায় রাজ্য সরকার। কংগ্রেস প্রার্থীকে অন্তর্বর্তী জামিন দেওয়ার বিচারপতির পর্যবেক্ষণ এবং পুলিশি পদক্ষেপের ওপর রক্ষাকবচের নির্দেশকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বৃহস্পতিবারই প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হয় নবান্ন। জানা গিয়েছে, প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ মামলাটি দায়ের করার অনুমতি দিয়েছে এবং শুক্রবার এই মামলারও সম্ভাব্য শুনানি হতে পারে। এর আগে আইনি প্রক্রিয়ায় হলদিয়া মহকুমা আদালত মিলনকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছিল। পরে খেজুরি থানার মামলায় কাঁথি আদালতও তাঁকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত জেল হেফাজতে পাঠায়। এখন একদিকে বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের এজলাসে বিকেল ৪টেয় পরবর্তী শুনানি, অন্যদিকে প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে রাজ্যের চ্যালেঞ্জ—এই জোড়া আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে মিলন প্রধান আদৌ জেলের বাইরে বেরিয়ে নিজের নির্বাচনী প্রচার সারতে পারবেন কি না।




