Rahul Gandhi: ‘ভোট চুরি হয়েছে, অপরাধীদের শাস্তি পেতেই হবে’, ৭ চক্রান্তকারীর তালিকা প্রকাশ করে মোদী-জ্ঞানেশকে তোপ রাহুলের
NEW DELHI: Rahul Gandhi বা লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবার দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে এক মেগা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনলেন। বৃহস্পতিবার দিল্লিতে আয়োজিত এক অত্যন্ত হাই-ভোল্টেজ সাংবাদিক বৈঠকে তিনি দাবি করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ উদ্যোগেই জ্ঞানেশ কুমারকে এই পদে বসানো হয়েছে। রাহুল অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে ২০২৩ সালের সেই বিতর্কিত বিলের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন, যার মাধ্যমে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কমিটি থেকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্তাদের কার্যকাল শেষ হওয়ার পরে তাঁদের বিরুদ্ধে যাতে কোনো ফৌজদারি প্রক্রিয়া শুরু করা না যায়, সেই আইনি রক্ষাকবচের পাকাপাকি বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। এই অভিযোগ সর্বসমক্ষে আসার পর জাতীয় রাজনীতিতে শাসক ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘাত আক্ষরিক অর্থেই এক নতুন এবং ভয়াবহ মোড় নিয়েছে।

এই সাংবাদিক বৈঠকে রাহুল গান্ধী আক্ষরিক অর্থেই ‘ভোট চুরির’ এক চাঞ্চল্যকর ব্লু-প্রিন্ট সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেন। তাঁর মঞ্চের ঠিক পিছনেই একটি বড় পোস্টার লাগানো ছিল, যেখানে তিনি সাত জন শীর্ষ ব্যক্তিকে ‘চক্রান্তকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই তালিকায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পাশাপাশি রয়েছেন বিশিষ্ট শিল্পপতি গৌতম আদানি, আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং প্রধানমন্ত্রীর দফতরের প্রধান সচিব পিকে মিশ্র। শুধু তাই নয়, এই সাত জন মূল চক্রীর ঠিক নিচেই নেতা, মন্ত্রী ও সংবাদমাধ্যমের কর্তাদের মিলিয়ে মোট ১২ জনকে ‘বোড়ে’ বা ঘুঁটি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সাংবাদিক বৈঠকে রাহুল প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বেশ কিছু পুরনো বক্তৃতার ভিডিও প্রদর্শন করেন। ওই ভিডিওগুলিতে ‘অবকি বার ৪০০ পার’, ‘৩০ বছর ধরে ক্ষমতায় বিজেপি থাকবে’ বা ‘পরবর্তী ৫০ বছর পর্যন্ত শুধুই জয়’-এর মতো দম্ভোক্তি শোনা গিয়েছে। রাহুল প্রশ্ন তোলেন, একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কীভাবে নেতারা আগেভাগেই এমন নিশ্চিত ঘোষণা করতে পারেন!
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সরাসরি আক্রমণের নিশানায় রেখে লোকসভার বিরোধী দলনেতা অভিযোগ করেন যে, সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভোটার তালিকা থেকে বিরোধী দলের সমর্থক ও ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার যে গভীর চক্রান্ত হয়েছিল, জ্ঞানেশ তা আড়াল করার চেষ্টা করছেন। রাহুলের স্পষ্ট দাবি, ভারতের নাগরিকদের আর কোনো ভোটাধিকার অবশিষ্ট নেই, এবং নির্বাচন কমিশনের বাকি দুই কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু ও বিবেক জোশী ঠিক এই বিষয়টিই বুঝতে পেরেছিলেন। আর সেই কারণেই তাঁরা জ্ঞানেশ কুমারকে পর পর এতগুলি সতর্কতামূলক চিঠি দিয়ে নিজেদের আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন। রাহুল গান্ধী অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, “ভোট চুরি হয়েছে, তার প্রমাণও দিয়েছি। অপরাধীদের শাস্তি পেতেই হবে, সব ফাঁস করব।” বর্তমান ভারতের গণতান্ত্রিক অবস্থাকে তিনি সাদ্দাম হোসেনের শাসনাধীন ইরাক এবং কিম জং উনের শাসনাধীন উত্তর কোরিয়ার একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, ওই দুই দেশের মতোই ভারতেও মোদী জমানায় ভোট চুরির মাধ্যমে বিরোধীদের হাওয়া সম্পূর্ণ উধাও করে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে।

‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর বিস্ফোরক অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে বিরোধীরা যে আর হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। বিরোধী দলগুলি নতুন করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ বা ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব আনার জন্য জোরকদমে প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে সংসদীয় সূত্রের খবর। মূলত জাতীয় কংগ্রেস এই বড় উদ্যোগটি গ্রহণ করেছে এবং ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটের অন্যান্য শরিক দলগুলিও এই কড়া পদক্ষেপে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। বৃহস্পতিবারের সাংবাদিক সম্মেলনে রাহুল গান্ধী প্রকাশ্যে জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা দাবি করলেও, সরাসরি সংসদে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনার বিষয়ে তিনি খোলসা করে কিছু বলেননি। তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সংসদের আসন্ন অধিবেশনে দুই কক্ষেই এই সংক্রান্ত নোটিস জারির প্রক্রিয়া শুরু করার ব্লু-প্রিন্ট ইতিমধ্যেই তৈরি করে ফেলেছে বিরোধী শিবির। যদি সত্যিই এই ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনা হয়, তবে তা ভারতের সংসদীয় এবং সাংবিধানিক ইতিহাসে এক অত্যন্ত বিরল এবং নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
অন্যদিকে, রাহুল গান্ধীর এই হাই-ভোল্টেজ সাংবাদিক সম্মেলন এবং একের পর এক মারাত্মক অভিযোগের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দলের সর্বভারতীয় মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারি বৃহস্পতিবার রাহুলের এই সমগ্র সাংবাদিক বৈঠকটিকে সম্পূর্ণ ‘নিষ্ফল’ এবং ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি লোকসভার বিরোধী দলনেতাকে তীব্র কটাক্ষ করে বলেন যে, রাহুল গান্ধী আসলে এমন এক জন চূড়ান্ত হতাশ নেতা, যিনি গণতান্ত্রিক উপায়ে দেশের সাধারণ মানুষের সমর্থন বা ভোট পেতে সম্পূর্ণভাবে অক্ষম। আর সেই রাজনৈতিক হতাশা থেকেই তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশনের মতো স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্তাদের বিরুদ্ধে এমন কাল্পনিক ভোট চুরির তত্ত্ব খাড়া করছেন। তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, জ্ঞানেশ কুমারকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের এই চরম সংঘাত এত সহজে থামার নয়। আগামী দিনে সংসদের ভেতরে এবং বাইরে এই নির্বাচন কমিশন বিতর্ক যে জাতীয় রাজনীতির মূল এজেন্ডা হতে চলেছে, তা কার্যত নিশ্চিত।




