Nandigram By Election: মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পরই নাটকীয় মোড়! নন্দীগ্রামে প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করে নিলেন মমতা শিবিরের সঞ্চিতা প্রধান দে
KOLKATA: রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা উপনির্বাচন (Nandigram By Election)-কে কেন্দ্র করে বঙ্গ রাজনীতিতে যে আক্ষরিক অর্থেই ভূমিকম্প শুরু হয়েছে, তা আজ আরও একবার প্রমাণিত হলো। পূর্ব মেদিনীপুরের হাইভোল্টেজ নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে ব্যালট বক্সে লড়াই শুরু হওয়ার আগেই কার্যত বিশাল বড় হারের সম্মুখীন হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। নবান্নে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী তথা নন্দীগ্রামের ভূমিপুত্র শুভেন্দু অধিকারীর (CM Suvendu Adhikari) সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের ঠিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নিজের প্রার্থীপদ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নিলেন মমতা শিবিরের ঘোষিত প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে (Sanchita Pradhan De)। বিরোধী শিবিরের হেভিওয়েট মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তৃণমূল প্রার্থীর এই গোপন বৈঠক ঘিরে গতকাল থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র জল্পনা চলছিল। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে, সঞ্চিতা হয়তো দলবদল করতে পারেন। কিন্তু দলবদল তো দূর, তিনি সরাসরি নির্বাচনী ময়দান থেকেই পিছু হটে গিয়ে তৃণমূল সুপ্রিমোকে এমন এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করালেন, যা রাজ্য রাজনীতির ইতিহাসে কার্যত নজিরবিহীন। প্রচারের ময়দানে নামার আগেই খোদ প্রার্থীর এই পিঠটান দেওয়া প্রমাণ করে যে, নন্দীগ্রামের মাটিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক প্রতাপ এবং নিয়ন্ত্রণ ঠিক কতটা শক্তিশালী।
সঞ্চিতা প্রধান দে-র এই প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের নেপথ্যে একাধিক রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কারণ উঠে আসছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সঞ্চিতা প্রধান দে নন্দীগ্রামের স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হলেও, তিনি মূলত একজন স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন, যাঁর চাকরি ২০১৪ সালের টেট (TET) দুর্নীতি মামলায় বাতিল হয়ে গিয়েছিল। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য হিসেবে কাজ করলেও, নন্দীগ্রামের মতো একটি অতি-স্পর্শকাতর এবং সর্বভারতীয় স্তরে চর্চিত আসনে শুভেন্দু অধিকারীর মতো প্রখর রাজনীতিবিদের মোকাবিলা করার মতো রাজনৈতিক ওজন তাঁর ছিল না। তার ওপর দলের প্রতীক ‘জোড়াফুল’ এবং নাম নির্বাচন কমিশন দ্বারা ফ্রিজ হয়ে যাওয়ায় তিনি মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্ত ছিলেন। এই চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার মধ্যেই তিনি নবান্নে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত সুকৌশলে তাঁকে নন্দীগ্রামের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা বুঝিয়ে বলেন এবং বিজেপির আগ্রাসী প্রচারের মুখে দাঁড়িয়ে তাঁর পরাজয় যে নিশ্চিত, সেই মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। আর সেই চাপের কাছে নতিস্বীকার করেই সঞ্চিতা ভোটের ময়দান থেকে সরে দাঁড়ানোর এই চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।

এই ঘটনার জেরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ এখন এক গভীর এবং নজিরবিহীন সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে সদ্য ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক পেয়ে কর্মীরা যখন নন্দীগ্রামে নতুন করে প্রচারের রূপরেখা তৈরি করছিলেন, ঠিক তখনই প্রার্থীর এই পলায়ন দলের নিচুতলার কর্মীদের মনোবলকে কার্যত মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল গত ১৬ সেপ্টেম্বর। যেহেতু মনোনয়ন পর্ব ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছে, তাই সঞ্চিতা প্রধান দে তাঁর মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের হাতে আর নতুন কোনো প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ আইনিভাবে অবশিষ্ট নেই। অর্থাৎ, নন্দীগ্রামের মতো প্রেস্টিজিয়াস আসনে মমতা শিবিরের কোনো প্রার্থীই আর রইল না! এটি তৃণমূল সুপ্রিমোর কাছে এক বিশাল বড় রাজনৈতিক পরাজয়, কারণ একুশের বিধানসভা নির্বাচনে এই নন্দীগ্রাম থেকেই তিনি শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন এবং এবার উপনির্বাচনে প্রার্থীহীন হয়ে তিনি কার্যত বিনাযুদ্ধেই ময়দান ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন।
অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে এটি এক অভাবনীয় এবং ঐতিহাসিক রাজনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক। নন্দীগ্রামে বিজেপি প্রার্থী হিসেবে তিনি দাঁড় করিয়েছেন তাঁরই নিহত আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানী রথকে। নিহত সন্তানের বিচারের দাবিতে এক মায়ের এই আবেগঘন প্রার্থিপদ ইতিমধ্যেই নন্দীগ্রামের গ্রামীণ ভোটারদের মধ্যে বিপুল সাড়া ফেলেছে। এর পাশাপাশি, বিরোধী শিবিরের প্রার্থীকে নবান্নে ডেকে এনে তাঁকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করার এই চাল প্রমাণ করে যে, রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী কতটা দোর্দণ্ডপ্রতাপ। বঙ্গ বিজেপির নেতারা ইতিমধ্যেই এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের ‘রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা’-র প্রচার শুরু করেছেন। তাঁদের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের প্রতি খোদ তৃণমূলের প্রার্থীদেরই আর কোনো আস্থা নেই, সাধারণ মানুষের তো প্রশ্নই ওঠে না। এই উপনির্বাচনে বিজেপি যে একতরফা এবং বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করতে চলেছে, প্রার্থীর এই পদত্যাগ তারই একটি নিশ্চিত পূর্বাভাস বলে মনে করছে গেরুয়া শিবির।

আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে এবং ফলাফল ঘোষণা হবে ৯ অক্টোবর। কিন্তু সঞ্চিতা প্রধান দে-র এই চরম নাটকীয় প্রস্থানের পর নন্দীগ্রামের নির্বাচন কার্যত একপেশে হয়ে দাঁড়াল। ময়দানে এখন বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে পড়ে রইল কেবল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ (খাম প্রতীক) এবং বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী মিলন প্রধান। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজস্ব শিবিরের অনুপস্থিতি এই নির্বাচন থেকে সমস্ত রাজনৈতিক উত্তাপ কেড়ে নিয়েছে। রাজ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন প্রার্থীর এভাবে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘটনা শুধু নন্দীগ্রাম নয়, গোটা রাজ্যের বিরোধী রাজনীতিতে এক মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলবে। আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাসঙ্গিকতা এবং তাঁর দলের টিকে থাকার লড়াই যে আরও বহুগুণ কঠিন হতে চলেছে, নন্দীগ্রামের এই অভূতপূর্ব ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।




