Election Commission: চূড়ান্ত হলো তৃণমূলের নতুন নাম ও প্রতীক! ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ নিয়ে মমতা শিবির, ‘খাম’ প্রতীকে লড়বেন ঋতব্রতরা
KOLKATA: রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা উপনির্বাচনের ঠিক আগে জাতীয় নির্বাচন কমিশন (Election Commission) এক ঐতিহাসিক এবং অভাবনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে চলা দীর্ঘ আইনি টানাপোড়েন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার পর এবার দলটির যুযুধান দুই শিবিরের জন্য নতুন নাম এবং প্রতীক চূড়ান্ত করল কমিশন। একদিকে দলের প্রতিষ্ঠাতা তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নেতৃত্বাধীন আদি শিবির এবং অন্যদিকে বর্তমান বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Ritabrata Banerjee) নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী ‘নব তৃণমূল’ শিবির—উভয়কেই তাঁদের নতুন আইনি ও রাজনৈতিক পরিচিতি দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন সদন থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠীকে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ (Mamata All India Trinamool Congress) নামে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের প্রচারের জন্য ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ (Football Player) প্রতীকটি বরাদ্দ করা হয়েছে। অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরটি এবার থেকে ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ (Democratic Trinamool Congress) নামে পরিচিত হবে এবং তাঁদের নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে দেওয়া হয়েছে ‘খাম’ বা এনভেলপ (Envelope)। আগামী ৬ অক্টোবর রাজ্যের যে কয়েকটি বিধানসভা কেন্দ্রে, বিশেষত নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে উপনির্বাচন হতে চলেছে, সেখানে এই দুই শিবির তাদের এই নতুন নাম ও নতুন প্রতীক নিয়েই সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হবে। এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্য রাজনীতিতে কার্যত এক নতুন যুগের সূচনা হতে চলেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের এই চূড়ান্ত নির্দেশটি বাংলার রাজ্য রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা করেছে। গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের মাধ্যমে মূল তৃণমূল কংগ্রেসের আদি নাম এবং মানুষের মনে গেঁথে থাকা অত্যন্ত পরিচিত ‘জোড়াফুল’ প্রতীকটিকে সাময়িকভাবে ফ্রিজ বা স্থগিত করে দিয়েছিল। কমিশনের প্রধান যুক্তি ছিল, যেহেতু দুই শিবিরই নিজেদেরকে আসল ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ বলে দাবি করে নির্বাচন সদনে নথিপত্র জমা দিয়েছে এবং উপনির্বাচনের ঠিক আগে এত অল্প সময়ের মধ্যে এই জটিল বিবাদের চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়, তাই কোনো পক্ষকেই আদি নাম ও প্রতীক ব্যবহারের অধিকার দেওয়া হবে না। এরপরেই কমিশন একটি নির্দেশিকা জারি করে দুই শিবিরকে তিনটি করে বিকল্প নতুন দলের নাম এবং কমিশনের ‘ফ্রি সিম্বল’ বা ফাঁকা প্রতীকের তালিকা থেকে তিনটি পছন্দের প্রতীক জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। শুক্রবার সকাল ১১টার মধ্যে দুই শিবির তাদের প্রস্তাবিত নাম ও প্রতীকের তালিকা কমিশনের দপ্তরে জমা করে। সেই তালিকার পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাইয়ের ওপর ভিত্তি করেই কমিশন এই নতুন নাম ও প্রতীক চূড়ান্ত করেছে। মমতা শিবিরের জন্য ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ এবং ঋতব্রত শিবিরের জন্য ‘খাম’ প্রতীকটি এখন থেকে তাদের নতুন রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে চলেছে, যা নিয়ে ভোটের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়বেন দলের নেতা-কর্মীরা।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে এই নতুন নাম এবং প্রতীক নিঃসন্দেহে তাঁর কাছে এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ। ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি তিনি যে দলটির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং নিজের হাতে যে ‘জোড়াফুল’ প্রতীকটি এঁকেছিলেন, তা আজ আইনি মারপ্যাঁচে তাঁর হাতছাড়া। তবে তাঁর অনুগামী এবং কালীঘাট শিবিরের শীর্ষ নেতারা মনে করছেন যে, ‘মমতা’ শব্দটি দলের নতুন নামের (‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’) সঙ্গে সরাসরি জুড়ে থাকায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো অনেক বেশি সহজ হবে। বাংলার রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং তাঁর সরকারের চালু করা বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোই আসল ট্রাম্পকার্ড। আর ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীকটিও বাংলার মানুষের অত্যন্ত কাছের এবং আবেগের একটি বিষয়। খেলাধুলার প্রতি বাংলার মানুষের যে দুর্নিবার টান রয়েছে, তাকে সুকৌশলে কাজে লাগিয়েই এই নতুন প্রতীককে সহজেই গ্রামীণ ভোটারদের মনে গেঁথে দেওয়া সম্ভব বলে মনে করছে কালীঘাট শিবির। দলের নিচুতলার কর্মীদের ইতিমধ্যেই কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরে অবিলম্বে ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীকের সমর্থনে দেওয়াল লিখন, ব্যানার তৈরি এবং বাড়ি বাড়ি প্রচার অভিযান শুরু করতে হবে। দলের নাম থেকে ‘তৃণমূল’ শব্দটি বাদ না যাওয়ায় এবং নামের শুরুতে দলনেত্রীর নাম থাকায় কর্মীরাও কিছুটা স্বস্তির শ্বাস ফেলছেন।
অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নির্বাচন কমিশনের এই নির্দেশকে তাদের এক বিরাট নৈতিক ও আইনি জয় হিসেবেই পরিগণিত করছে। গত মে মাসের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দলের একটা বড় অংশের বিধায়ক শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন এবং তাঁকে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর তাঁরা দলের জাতীয় কর্মসমিতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আইনি যুক্তি দেখিয়ে প্রবীণ নেতা অরূপ রায়কে দলের নতুন চেয়ারপার্সন হিসেবে ঘোষণা করেন। নির্বাচন কমিশনের কাছে তাঁদের প্রধান দাবিই ছিল যে, মমতা শিবির যেন কোনোভাবেই উপনির্বাচনে মূল দলের ‘জোড়াফুল’ প্রতীকটি একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে না পারে। সেই দাবি একশো শতাংশ পূরণ হওয়ার পর এবার ‘খাম’ বা এনভেলপ প্রতীকটিকে সামনে রেখে তাঁরা নতুন রাজনৈতিক লড়াই শুরু করতে চলেছেন। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় মুখ খুলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, রাজনৈতিক দল কোনো প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি নয় এবং এর ওপর কোনো একক ব্যক্তি বা পরিবারের একচেটিয়া বংশানুক্রমিক অধিকার থাকতে পারে না।

উপনির্বাচনের ঠিক মুখে এই অভাবনীয় প্রতীক ও নাম বদলের ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজিয়ে দিয়েছে। আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরে যে হাইভোল্টেজ ও টানটান উত্তেজনার নির্বাচন হতে চলেছে, তা কেবল দুজন বিধায়ক নির্বাচনের লড়াই নয়, বরং এই দুই নতুন তৃণমূল শিবিরের অস্তিত্ব প্রমাণের এক চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা। গ্রামীণ ভোটাররা দশকের পর দশক ধরে ঘাসফুলের ওপর ‘জোড়াফুল’ প্রতীকে ভোট দিয়ে অভ্যস্ত। এখন মাত্র কয়েকদিনের নোটিশে মমতা শিবিরের ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ এবং ঋতব্রত শিবিরের ‘খাম’ প্রতীক দুটি সাধারণ মানুষের মগজে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, তৃণমূলের এই আড়াআড়ি বিভাজন এবং প্রতীকহীনতার ডামাডোলকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে চাইবে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বঙ্গ বিজেপি ইতিমধ্যেই এই দুই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে আগ্রাসী প্রচার শুরু করেছে এবং শাসকদলের এই ডামাডোলকে হাতিয়ার করে সাধারণ ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছে। শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সে কোন তৃণমূল সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায় করতে পারে এবং নতুন অচেনা প্রতীকগুলি ভোটারদের কতটা আকৃষ্ট করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলার রাজনীতির আগামী দিনের গতিপথ ও শাসকদলের ভবিষ্যৎ।




