Bikash Ranjan Bhattacharya Summoned: ১৩ তারিখ গড়ফা ও ১৪ তারিখ কসবা থানায় হাজিরার নির্দেশ প্রবীণ আইনজীবীকে
Kolkata: রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বেঁধে দেওয়া ডেডলাইন শেষ হওয়ার ঠিক পরেই এবার বড়সড় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করল প্রশাসন। প্রবীণ সিপিএম নেতা তথা বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিশ পাঠিয়ে তলব করল পুলিশ। নিজের বাসভবনে হামলার ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে একটি ফেসবুক পোস্টে তিনি আক্রমণকারীদের ‘হিন্দুত্ববাদী’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এই নির্দিষ্ট শব্দচয়নকে কেন্দ্র করেই রাজ্য রাজনীতিতে এক বিশাল বিতর্কের সূত্রপাত হয়। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী একটি প্রকাশ্য জনসভা থেকে ওই শব্দটি প্রত্যাহার করার জন্য তাঁকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। কিন্তু রবিবার দুপুরে সেই নির্ধারিত চরম সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার পরেও প্রবীণ এই বামপন্থী নেতা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, তিনি কোনো অবস্থাতেই তাঁর ওই ফেসবুক পোস্ট সংশোধন করবেন না। এরপরেই রবিবার রাতে পুলিশ দ্রুত তৎপর হয়ে ওঠে এবং তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে নোটিশ পাঠায়। প্রশাসনিক এই কড়া পদক্ষেপের ফলে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে আগামী ১৩ তারিখ গড়ফা থানায় এবং ১৪ তারিখ কসবা থানায় সশরীরে উপস্থিত থাকার জন্য কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মূলত তাঁর ওই বিতর্কিত ফেসবুক পোস্টের ভিত্তিতে জমা পড়া একাধিক অভিযোগের জেরেই পুলিশ এই আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতেই আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ পৃথকভাবে লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছিল শহরের গড়ফা ও তপসিয়া থানায়। গড়ফা থানায় তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করার অভিযোগ দায়ের করেছিলেন প্রীতম দত্ত নামক এক স্থানীয় ব্যক্তি। অন্যদিকে, তপসিয়া থানায় অনুরূপ একটি অভিযোগ দায়ের করেছিলেন সুরজ সিং নামের এক বিজেপি কর্মী। এই জোড়া অভিযোগের ভিত্তিতেই গড়ফা ও কসবা থানা থেকে তাঁকে তলব করা হয়েছে। একজন বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা, প্রাক্তন মেয়র এবং অত্যন্ত সম্মানীয় আইনজীবীকে এভাবে থানায় ডেকে পাঠানোর নোটিশ বঙ্গ রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব মাত্রা যোগ করেছে এবং শাসক-বিরোধী আইনি লড়াইয়ের সম্ভাবনাকে আরও প্রবল করে তুলেছে।
![]()
এই নজিরবিহীন এবং তিক্ত বিতর্কের একেবারে সূত্রপাত হয়েছিল গত বৃহস্পতিবার খুব ভোরে, যখন যাদবপুর চত্বরে অবস্থিত বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের বাড়িতে আচমকাই হামলা চালায় বেশ কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতী। মুখে কাপড় বাঁধা অবস্থায় ওই দুষ্কৃতীরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাঁর বাড়ি লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি পাথর এবং কাঁচের বোতল ছুড়তে শুরু করে। এই অতর্কিত হামলায় তাঁর বাড়ির জানলার কাঁচ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আতঙ্ক ছড়ায়। ঘটনার ঠিক পরেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হন তিনি। নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ পোস্ট করে তিনি এই কাপুরুষোচিত হামলার নেপথ্যে সরাসরি ‘হিন্দুত্ববাদী গুন্ডা’দের দিকে আঙুল তোলেন। যদিও এই ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ ইতিমধ্যেই ২ জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করেছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এবং দাবিতে উঠে এসেছে যে, ওই ধৃত ২ জন দুষ্কৃতীর সঙ্গে আদতে রাজ্যের অন্যতম বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের গভীর যোগসূত্র রয়েছে এবং এটি কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর কাজ নয়।
পুলিশের এই গ্রেফতারি এবং ধৃতদের রাজনৈতিক পরিচয়ের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরেই বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের ওই ফেসবুক পোস্ট এবং ‘হিন্দুত্ববাদী’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে সরাসরি তীব্র আপত্তি জানান রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একটি জনসভা থেকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত কড়া ভাষায় প্রবীণ এই আইনজীবীর সমালোচনা করেন এবং তাঁকে চরম সময়সীমা বা ডেডলাইন বেঁধে দেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ওই শব্দটি সংশোধন বা প্রত্যাহার না করলে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু বিকাশরঞ্জন পালটা জোরালো যুক্তি দিয়ে জানান যে, তিনি কোনোমতেই শব্দটি মুছবেন না, কারণ তাঁর মতে সনাতন হিন্দু ধর্ম এবং রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদ সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। তিনি প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তোলেন, মুখ্যমন্ত্রীকে এই ধরনের অগণতান্ত্রিক নির্দেশ দেওয়ার অধিকার কে দিয়েছে? তাঁর এই আপসহীন এবং অনড় অবস্থানের ফলেই রবিবার দুপুরে ডেডলাইন শেষ হওয়ার পর রবিবার রাতেই জোড়া থানা থেকে তাঁর কাছে তলবের নোটিশ এসে পৌঁছয়।

বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের মতো একজন দুঁদে আইনজীবীকে পুলিশের এই তলব ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে এখন জোর চর্চা শুরু হয়েছে। একদিকে যেমন শাসক দল এবং গেরুয়া শিবিরের একাংশ মনে করছে যে, সামাজিক মাধ্যমে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করার জন্য যথাযথ আইনি ব্যবস্থা হওয়া উচিত, অন্যদিকে বাম ও অন্যান্য বিরোধী শিবির এটিকে বাকস্বাধীনতার ওপর সরাসরি প্রশাসনিক আক্রমণ বলে আখ্যা দিচ্ছে। এখন দলমত নির্বিশেষে সকলের নজর আগামী ১৩ এবং ১৪ তারিখের দিকে। বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য কি পুলিশি নোটিশকে মান্যতা দিয়ে নির্ধারিত দিনে গড়ফা ও কসবা থানায় হাজিরা দেবেন, নাকি এই তলবের বিরুদ্ধে পালটা আইনি পথে হেঁটে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়ে রক্ষাকবচ চাইবেন, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সব মিলিয়ে, একটি সাধারণ ফেসবুক পোস্ট এবং একটি নির্দিষ্ট শব্দকে কেন্দ্র করে বঙ্গ রাজনীতির জল যেভাবে ঘোলা হচ্ছে এবং প্রশাসনিক সংঘাত বাড়ছে, তা আগামী দিনে আরও বড়সড় আইনি ও রাজনৈতিক তরজার রূপ নিতে চলেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।




