Kedarnath Carry Me Back: পবিত্র পাহাড়কে দূষণমুক্ত করতে সাধারণ তীর্থযাত্রীদের ঐতিহাসিক মেগা সাফাই অভিযান
কেদারনাথ: পর্যটনস্থল বা পবিত্র তীর্থস্থানে বেড়াতে গিয়ে যত্রতত্র প্লাস্টিক, জলের বোতল বা খাবারের প্যাকেট ফেলে নোংরা করা ১ শ্রেণির দায়িত্বজ্ঞানহীন পর্যটকের দীর্ঘদিনের স্বভাব। ভারতের মতো বিশাল এবং বৈচিত্র্যময় দেশে এই সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করে, যেখানে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে ভিড় জমান। কিন্তু সেই ভারতেই এবার ১টি সম্পূর্ণ উলটো এবং অত্যন্ত ইতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে উত্তরাখণ্ডের পবিত্র হিন্দু তীর্থস্থান কেদারনাথে। পুণ্যার্থীদের ফেলে যাওয়া লাগামছাড়া প্লাস্টিক বর্জ্যে যখন হিমালয়ের এই অংশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রীতিমতো বিঘ্নিত হচ্ছিল, ঠিক তখনই কেদারনাথের পবিত্র পাহাড়কে দূষণমুক্ত এবং পরিষ্কার করার ১টি ঐতিহাসিক দায়িত্ব নিজেদের কাঁধেই তুলে নিলেন হাজার হাজার সাধারণ পুণ্যার্থী। তীর্থযাত্রীদের এই অভিনব এবং অনুপ্রেরণামূলক উদ্যোগের ১টি বিশেষ পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে, যা হলো ‘ক্যারি মি ব্যাক’ বা আমাকে ফিরিয়ে আনো। বিগত কয়েক মাসে এই কর্মসূচির অবিশ্বাস্য সাফল্য গোটা দেশের কাছে ১টি নতুন এবং জ্বলন্ত উদাহরণ তৈরি করেছে যে, সাধারণ মানুষ সচেতন হলে সব কিছুই সম্ভব।
ভারতের অন্যতম প্রধান এবং জাগ্রত হিন্দু তীর্থ কেদারনাথ মন্দিরটি হিমালয়ের বুকে ঠিক ১১,৭৫৫ ফুট উঁচু ১টি অত্যন্ত দুর্গম এবং বিপদসঙ্কুল পাহাড়ে অবস্থিত। উত্তরাখণ্ডের গৌরীকুণ্ড থেকে শুরু করে পাহাড়ের গা বেয়ে অন্তত ১৮ কিলোমিটারের ১টি অত্যন্ত খাঁড়াই এবং কষ্টসাধ্য হাঁটা পথে হেঁটে অথবা ঘোড়ার পিঠে চড়ে পুণ্যার্থীদের সেখানে পৌঁছতে হয়। এত অধিক উচ্চতায় এবং অত্যন্ত প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সেখানে যাতায়াত করাই যেখানে ১টি বিশাল চ্যালেঞ্জ, সেখানে কঠিন আবর্জনা ব্যবস্থাপনা বা ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রশাসন এবং পরিবেশবিদদের কাছে কার্যত ১টি দুঃস্বপ্নের মতো কঠিন কাজ হয়ে পড়েছিল। প্রতিদিন হাজার হাজার পুণ্যার্থীর ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক পাহাড়ে জমতে জমতে ১টি ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, যা স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছিল। এই কঠিন বাস্তব পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই অবশেষে গত জুন মাসে উত্তরাখণ্ডের স্থানীয় প্রশাসনের তরফ থেকে ‘ক্যারি মি ব্যাক’ শিরোনামে ১টি অভিনব এবং মেগা সাফাই অভিযানের ডাক দেওয়া হয়েছিল, যা আজ ১টি মেগা গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

প্রশাসনের এই ডাকে একেবারে অভাবনীয় এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা আপামর তীর্থযাত্রীরা। তাঁরা নিজেদের মন থেকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন যে, কেদারনাথের মতো ১টি পবিত্র তীর্থস্থানকে রক্ষা করার প্রাথমিক দায়িত্ব তাঁদের নিজেদেরই, শুধুমাত্র সরকারের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না। হাজার হাজার পুণ্যার্থী যখন কেদারনাথ দর্শন সেরে অত্যন্ত ক্লান্ত শরীরে পাহাড় থেকে নিচে নামছেন, তখন তাঁরা ১টি অভিনব এবং মহৎ কাজ করছেন। নিজেদের প্রয়োজনীয় ভারী জিনিসপত্রের পাশাপাশি তাঁরা সঙ্গে করে আনছেন বস্তা ভর্তি প্লাস্টিক বর্জ্য, পরিত্যক্ত জলের বোতল, চিপসের প্যাকেট এবং অন্যান্য শুকনো আবর্জনা। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই অসাধ্য সাধনের কাজে তাঁদের কেউ বিন্দুমাত্র বাধ্য করছেন না, স্থানীয় প্রশাসনের ১টি ছোট্ট উদ্যোগে তাঁরা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিচ্ছেন। প্রশাসনের দেওয়া ১টি সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানা গিয়েছে যে, এইভাবেই গত কয়েক মাসে শুধুমাত্র এই কর্মসূচির মাধ্যমে অন্তত ৫,০০০ পুণ্যার্থী নিজেদের কাঁধে করে ১২ টনেরও বেশি মারাত্মক প্লাস্টিক বর্জ্য কেদারনাথ থেকে নিচে সাফ করে এনেছেন।

তীর্থযাত্রীদের এই অভাবনীয় সাফল্যের খবর এবং ছবি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জনপ্রিয় সমাজমাধ্যমে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কার্যত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। পুণ্যার্থীদের এই অত্যন্ত ইতিবাচক এবং নিঃস্বার্থ উদ্যোগকে আজ কুর্নিশ জানাচ্ছে গোটা দেশের মানুষ। সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ভাইরাল হওয়া ১টি বিশেষ ভিডিওতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছে যে, তামিলনাড়ু সহ ভারতের দক্ষিণের একাধিক রাজ্য এবং ওড়িশা থেকে আসা ১দল বয়স্ক পর্যটকও নিজেদের কাঁধে প্লাস্টিক বর্জ্য ভর্তি ব্যাগ চাপিয়ে অত্যন্ত সন্তর্পণে পাহাড় বেয়ে নিচে নামিয়ে আনছেন। এমনকী, কাউকে কাউকে আবার নিজেদের পাহাড়ি সাইকেলে করেও অত্যন্ত শারীরিক কসরত করে ওই ভারী বর্জ্যের ব্যাগ নিচে নামিয়ে আনতে দেখা গিয়েছে, যা সত্যিই অভাবনীয়। পরিবেশ রক্ষার প্রতি তাঁদের এই চরম নিষ্ঠা এবং ডেডিকেশন দেখে মুগ্ধ ইন্টারনেট দুনিয়ার নেটিজেনরা। এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া একাধিক পুণ্যার্থী সংবাদমাধ্যমের কাছে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, এই মহৎ এবং পবিত্র উদ্যোগের ১টি ক্ষুদ্র অংশ হতে পেরে তাঁরা নিজেদের জীবনে ১টি পরম স্বর্গীয় আত্মতৃপ্তি লাভ করেছেন।
গত ৪ মাসে গৌরীকুণ্ডের বেস ক্যাম্পে শুধুমাত্র সাধারণ পুণ্যার্থীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১২ টনের বেশি কঠিন বর্জ্য নামিয়ে আনার ঘটনাটি ভারতের পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাসে ১টি অন্যতম বড় মাইলফলক হিসেবে চিরকাল চিহ্নিত হয়ে থাকবে। কেদারনাথ নগর পঞ্চায়েতের এই ক্যারি মি ব্যাক উদ্যোগ একেবারে হাতেকলমে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, প্রশাসনের সামান্য সদিচ্ছা এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলে যেকোনো পাহাড় বা জঙ্গলকে রক্ষা করা খুব সহজেই সম্ভব। এই উদ্যোগ অভাবনীয়ভাবে সফল হওয়ার পর এখন দেশের প্রথম সারির পরিবেশবিদরা জোরালো দাবি তুলছেন যে, শুধুমাত্র কেদারনাথ নয়, বদ্রীনাথ, গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী সহ ভারতের সমস্ত পাহাড়ি তীর্থস্থান এবং ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রগুলিতে এই একই মডেল বা কর্মসূচি অবিলম্বে বাধ্যতামূলকভাবে চালু করা উচিত। এতে একদিকে যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রশাসনের বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে তেমনই পর্যটকদের মধ্যেও পরিবেশ সচেতনতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে। কেদারনাথের পুণ্যার্থীরা আজ যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তা আগামী প্রজন্মের জন্য ১টি সুস্থ এবং প্লাস্টিকমুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলার লড়াইয়ে ১টি বিশাল বড় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।




