Kolkata: লেনিন সরণি, কার্ল মার্কস সরণির নাম বদল! খাস কলকাতায় বামপন্থী স্মৃতি মুছতে বিরাট সিদ্ধান্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর

Published:

Kolkata: লেনিন সরণি, কার্ল মার্কস সরণির নাম বদল! খাস কলকাতায় বামপন্থী স্মৃতি মুছতে বিরাট সিদ্ধান্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর

KOLKATA: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের পথে পা বাড়াল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কলকাতার বুকে থাকা বিদেশি কমিউনিস্ট আইকনদের নামাঙ্কিত রাস্তাগুলির নাম পরিবর্তনের জন্য এক ঐতিহাসিক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে নবান্নের তরফে। লেনিন সরণি, কার্ল মার্কস সরণি এবং হো চি মিন সরণির মতো খাস কলকাতার অত্যন্ত পরিচিত ও ব্যস্ত রাস্তাগুলির নাম বদলে বাংলার নিজস্ব মণীষী, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং জাতীয়তাবাদী নেতাদের নামে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য প্রশাসন। এই মেগা সিদ্ধান্ত কেবল কোনো প্রশাসনিক রদবদল নয়, বরং এটি রাজ্যের আদর্শগত প্রেক্ষাপট এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাস পুনর্লিখনের এক সুস্পষ্ট ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ। রাজনৈতিক মহলের মতে, দীর্ঘ ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের যে স্মৃতি কলকাতার আনাচে কানাচে সাইনবোর্ড হয়ে ঝুলছে, তা সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলে জাতীয়তাবাদী আবেগকে সুপ্রতিষ্ঠিত করাই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের প্রধান লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্যেই এবার খোদ রাজধানীর বুকে এক ব্যাপক নাম বদলের অভিযানের রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: TMC Symbol Freeze: জোড়াফুল প্রতীক ও ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ফ্রিজ করল নির্বাচন কমিশন! উপনির্বাচনে নতুন নামে লড়বে মমতা ও ঋতব্রত শিবির 

খাস কলকাতার রাস্তার নামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বামফ্রন্ট সরকারের দীর্ঘ শাসনকালের ইতিহাস এবং তাঁদের আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট মতাদর্শ। সত্তরের দশক এবং তার পরবর্তী সময়ে তৎকালীন বাম সরকার কলকাতার একাধিক ঐতিহাসিক রাস্তার নাম পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট নেতা ও চিন্তাবিদদের নামে রেখেছিল। উদাহরণস্বরূপ, শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘ধর্মতলা স্ট্রিট’-এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছিল রুশ বিপ্লবের প্রবাদপ্রতিম নেতা ভ্লাদিমির লেনিনের নামে ‘লেনিন সরণি’। একইভাবে ব্রিটিশ আমলের ‘হ্যারিসন রোড’ বা ক্যামাক স্ট্রিট সংলগ্ন এলাকার রাস্তার নাম ভিয়েতনামের নেতার নামে ‘হো চি মিন সরণি’ এবং খিদিরপুর সংলগ্ন এলাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাস্তার নাম ‘কার্ল মার্কস সরণি’ রাখা হয়েছিল। বর্তমান বিজেপি সরকারের যুক্তি হলো, এই বিদেশি কমিউনিস্ট নেতাদের সঙ্গে বাংলার মাটি, মানুষ, সংস্কৃতি বা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কোনো ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। বরং এঁদের নাম ভারতের গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী মূল্যবোধের পরিপন্থী। তাই অবিলম্বে এই নামগুলি বাতিল করে ভারতের নিজস্ব ঐতিহাসিক চরিত্রদের সম্মান জানানো উচিত।

Advertisement Andaman Vibes

রাজ্য পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের শীর্ষ আধিকারিকদের সূত্রে জানা গিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া নির্দেশেই এই নাম বদলের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হচ্ছে। প্রস্তাবিত এই খসড়ায় বলা হয়েছে যে, বিদেশি মতাদর্শের ধারক ও বাহকদের পরিবর্তে বাংলার নিজস্ব গর্বের ধন—যেমন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, স্বামী বিবেকানন্দ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ঋষি অরবিন্দ এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো মহামানবদের আদর্শকে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে আরও বেশি করে জুড়ে দিতে হবে। নতুন নামকরণের ক্ষেত্রে বাংলার সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী এবং বিপ্লবীদের নাম অগ্রাধিকার পাবে। প্রশাসনিক স্তরে ইতিমধ্যেই কলকাতা পুরসভাকে এই বিষয়ে একটি বিস্তারিত রূপরেখা তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুরসভার অন্দরে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে কোন রাস্তার কী নাম রাখা হবে এবং স্থানীয় নাগরিকদের আবেগ যাতে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়, তা খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়েছে। নাম বদলের এই আইনি এবং দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে বেশ কয়েকমাস সময় লাগলেও, সরকার যে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এই কাজ শেষ করতে চাইছে, তা প্রশাসনিক তৎপরতা থেকেই স্পষ্ট।

আরও পড়ুন: Nandigram BJP Candidate: ‘রথ’ বিতর্কে অভিষেকের খোঁচার কড়া জবাব! নন্দীগ্রামে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানী রথের মন্তব্যে শোরগোল 

রাজ্য সরকারের এই মেগা সিদ্ধান্তের খবর প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে রীতিমতো ঝড় উঠেছে। সিপিআই(এম) এবং বামফ্রন্টের অন্যান্য শরিক দলগুলি সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে রাস্তায় নামার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বাম নেতাদের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার ইতিহাসকে বিকৃত করার এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জঘন্য খেলায় মেতেছে। তাঁদের মতে, মার্কস, লেনিন বা হো চি মিন কেবল কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার নেতা নন, তাঁরা বিশ্বজুড়ে মেহনতি মানুষের লড়াই এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের প্রতীক। অন্যদিকে, বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসও এই নাম বদলের উদ্যোগকে ‘সস্তা রাজনীতির চমক’ এবং ‘মূল সমস্যা থেকে নজর ঘোরানোর কৌশল’ বলে কটাক্ষ করেছে। তবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিরোধীদের এই সমস্ত অভিযোগকে কার্যত উড়িয়ে দিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, বাংলার ঐতিহ্য এবং জাতীয়তাবাদী আবেগের ওপর কোনো বিদেশি কমিউনিস্ট নেতার ছায়া তিনি কিছুতেই বরদাস্ত করবেন না। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, বাংলার নতুন প্রজন্মকে লেনিন বা মার্কসের বদলে বাংলার ভূমিপুত্রদের সম্পর্কে জানা এবং তাঁদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়া অনেক বেশি জরুরি।

Advertisement পরিশেষে বলা যায়, কলকাতার রাস্তার নাম বদলের এই প্রস্তাব বাংলার রাজনৈতিক ও আদর্শগত পটপরিবর্তনের এক অন্যতম বড় টার্নিং পয়েন্ট। দীর্ঘ বাম আমলের পর রাজ্যে যখন বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা নিজেদের জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে চাইবে। লেনিন, মার্কস বা হো চি মিনের নামাঙ্কিত সাইনবোর্ডগুলি হয়তো খুব শীঘ্রই কলকাতার রাস্তা থেকে চিরতরে বিদায় নেবে এবং তার জায়গায় স্থান পাবে নতুন কোনো দেশীয় আইকনের নাম। এই পরিবর্তনের প্রভাব যে শুধুমাত্র রাস্তার সাইনবোর্ডেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা বাংলার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাধারায় এক গভীর রেখাপাত করবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আগামী দিনে সাধারণ কলকাতাবাসী এই নতুন নামগুলির সঙ্গে কতটা আত্মিক যোগ স্থাপন করতে পারবেন এবং বিরোধীদের রাজনৈতিক আন্দোলন ব্যালট বাক্সে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার। তবে এটা নিশ্চিত যে, খাস কলকাতায় বামপন্থী স্মৃতি মুছতে শুভেন্দু সরকারের এই মেগা সিদ্ধান্ত বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন এবং দীর্ঘস্থায়ী আদর্শগত বিতর্কের জন্ম দিল।

Ad

Kingshuk Singha Roy
Kingshuk Singha Roy
Founder & Editor-in-Chief বাংলার আওয়াজের প্রতিষ্ঠাতা। ২০১৭ সাল থেকে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের সাথে যুক্ত। সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল মিডিয়া নিয়ে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

Related articles

spot_img

Recent articles

spot_img