Mandarmani Beach: মন্দারমণিতে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ ‘রেড জোন’! পুজোর মরশুমে একগুচ্ছ নির্দেশিকা
Mandarmani Beach: বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো আসতে আর মাত্র কয়েকটা দিনের অপেক্ষা। পুজোর এই দীর্ঘ ছুটির মরশুমে রাজ্যবাসীর অন্যতম প্রধান এবং জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য হলো পূর্ব মেদিনীপুরের সৈকত শহর দিঘা এবং মন্দারমণি। প্রতি বছরই এই সময়ে লক্ষ লক্ষ পর্যটক সমুদ্রের টানে এই দুই জায়গায় ভিড় জমান। কিন্তু আনন্দের এই আবহে যাতে কোনোভাবেই কোনো বিষাদের সুর বেজে না ওঠে, তার জন্য এবার আগেভাগেই চরম সতর্কতা অবলম্বন করতে শুরু করেছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা প্রশাসন। গত কয়েক দিনে মন্দারমণি সৈকতে বেশ কয়েকটি দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা ঘটার পর প্রশাসন রীতিমতো উদ্বিগ্ন। বারবার মাইকিং করে সতর্ক করার পরেও পর্যটকদের একাংশের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে বিপদের ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মাত্র এক মাসের মধ্যে সমুদ্রে স্নান করতে নেমে তলিয়ে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত পাঁচ জন পর্যটক। একের পর এক এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর আর কোনো ঝুঁকি নিতে নারাজ প্রশাসন। তাই পর্যটকদের নিরপত্তার স্বার্থে এবার মন্দারমণি সৈকতের মোহনা সংলগ্ন প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাকে স্নানের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করল পুলিশ।
![]()
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশ এবং মন্দারমণি উপকূল থানার যৌথ উদ্যোগে সৈকতের তিন নম্বর ঘাট সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এই বিশেষ নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়েছে। মূলত সমুদ্রের মোহনা এলাকাটিকে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, কারণ সেখানে জলের গভীরতা এবং স্রোতের টান অন্যান্য জায়গার তুলনায় অনেকটাই বেশি। এই বিপদের কথা মাথায় রেখেই তিন নম্বর ঘাট থেকে শুরু করে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সারি সারি বাঁশের খুঁটি পোঁতা হয়েছে। সেই খুঁটিগুলোর সঙ্গে মোটা দড়ি এবং লাল রঙের ফিতে বেঁধে পুরো এলাকাটিকে ‘রেড জোন’ বা বিপজ্জনক এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো অতি উৎসাহী পর্যটক যাতে স্নান করতে করতে নিজেদের অজান্তেই ওই নির্ধারিত সীমানা পেরিয়ে সমুদ্রের গভীর এবং বিপজ্জনক অংশে নেমে না পড়েন, ঠিক সেই লক্ষ্যেই এই বিশেষ বাঁশের ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। প্রশাসনের আধিকারিকদের দৃঢ় বিশ্বাস, সৈকতের বুকে এই ধরনের কড়াকড়ি এবং লাল ফিতে দিয়ে ঘেরা ‘রেড জোন’ চিহ্ন দেখে পর্যটকেরা মানসিকভাবে অনেক বেশি সতর্ক হবেন এবং বিপদের ঝুঁকি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হবে।

পুজোর সময় পর্যটকদের ভিড় সামলাতে এবং নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনের প্রস্তুতি ঠিক কতটা, সেই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পুলিশ সুপার অংশুমান সাহা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, পর্যটন কেন্দ্রের প্রতিটি ঘাটে পুলিশ, সিভিক ভলান্টিয়ার, স্থানীয় নুলিয়া এবং বিশেষ উদ্ধারকারী দল সবসময় কড়া নজরদারি চালাচ্ছে। আসন্ন পুজোর মরশুমে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়ের কথা মাথায় রেখে উদ্ধারকারী দলের সদস্য সংখ্যা একধাক্কায় অনেকটাই বাড়ানো হচ্ছে। পুলিশ সুপার জানান, আগে যেখানে সৈকতের নিরাপত্তায় গড়ে ষাট থেকে পঁয়ষট্টি জন কর্মী নিযুক্ত থাকতেন, এখন সেই সংখ্যা বাড়িয়ে একশো জন করা হচ্ছে। শুধু লোকবল বাড়ানোই নয়, এই উদ্ধারকারী দলের প্রত্যেক সদস্যকে ইতিমধ্যেই আধুনিক পদ্ধতির বিশেষ প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। কোনো পর্যটক সমুদ্রে তলিয়ে গেলে কীভাবে তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে, সেই বিষয়ে কর্মীদের পুরোপুরি প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

মন্দারমণির পাশাপাশি রাজ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র দিঘার নিরাপত্তাতেও আনা হচ্ছে বড়সড় বদল। গত কয়েক মাসে দিঘার সমুদ্রেও স্নান করতে নেমে তলিয়ে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া এবং মৃত্যুর মতো একাধিক বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছে। তাই পুজোর মরশুমে দিঘায় যাতে কোনোভাবেই দুর্ঘটনার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী না হয়, তা নিশ্চিত করতে চরম তৎপরতা শুরু করেছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশ। জানা গিয়েছে, দিঘার বিস্তীর্ণ সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পুলিশ এবং সিভিক ভলান্টিয়ার মোতায়েন করা হচ্ছে। পাশাপাশি, নুলিয়াদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সমুদ্রে নজরদারি চালানো এবং উদ্ধারকাজ আরও দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করার জন্য পুলিশকে নতুন এবং অত্যাধুনিক স্পিডবোট দেওয়া হচ্ছে। এই স্পিডবোটগুলোর সাহায্যে সমুদ্রের অনেকটা গভীর পর্যন্ত নজরদারি চালানো সম্ভব হবে এবং কেউ বিপদে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে তাঁর কাছে পৌঁছে গিয়ে প্রাণ বাঁচানো অনেক সহজ হবে বলে মনে করছে পুলিশ প্রশাসন।

আরও পড়ুনঃ India vs Pakistan Hockey: উনপঞ্চাশ সেকেন্ড বাকি থাকতে গোল! পাকিস্তানকে হারিয়ে এশিয়াডের ফাইনালে ভারত।
তবে প্রশাসন যতই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করুক না কেন, পর্যটকদের নিজেদের সচেতনতা যে সবথেকে বেশি প্রয়োজন, সেই কথাটি বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন পূর্ব মেদিনীপুর জেলার জেলাশাসক নিরঞ্জন কুমার। পর্যটকদের উদ্দেশ্যে একটি অত্যন্ত কড়া অথচ মানবিক বার্তা দিয়ে জেলাশাসক জানিয়েছেন যে, উৎসবের আনন্দ যেন কোনোভাবেই নিজেদের জীবনে বড় কোনো বিপদ ডেকে না আনে, সেই দিকে সাধারণ মানুষকেই সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখতে হবে। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন যে, পর্যটকেরা যদি নিজেরাই নিজেদের জীবনের মূল্য না বোঝেন এবং বেপরোয়াভাবে সমুদ্রে নামেন, তবে শুধু মাইকে প্রচার করে বা ব্যারিকেড দিয়ে সব দুর্ঘটনা আটকানো সম্ভব নয়। তাই পর্যটকদের কাছে প্রশাসনের বিনীত অনুরোধ, তাঁরা যেন সমুদ্রস্নানের সময় স্থানীয় পুলিশ এবং নুলিয়াদের দেওয়া নির্দেশিকা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। মদ্যপ অবস্থায় সমুদ্রে নামা থেকে বিরত থাকা এবং বিপদসীমা অতিক্রম না করার মতো সাধারণ নিয়মগুলো মেনে চললে দিঘা এবং মন্দারমণির সৈকত সকলের জন্যই এক নিরাপদ এবং আনন্দদায়ক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা উপহার দিতে পারবে।




