RSS: ঢালু রাস্তাতেই দুর্ঘটনা বেশি ঘটে! রাজ্যের স্বয়ংসেবকদের সতর্ক করে চরিত্র সংরক্ষণে জোর আরএসএস নেতৃত্বের
NEW TOWN: RSS বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের দীর্ঘদিনের লড়াই এবং রাজনৈতিক পালাবদলের পর পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি ক্ষমতায় রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এই বিপুল সাফল্যের পরেও সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকরা যাতে কোনোভাবেই আত্মতুষ্টিতে না ভোগেন বা তাঁদের শৃঙ্খলায় কোনো শিথিলতা না আসে, সে বিষয়ে এবার অত্যন্ত কড়া সতর্কবার্তা দিল আরএসএস নেতৃত্ব। বুধবার নিউ টাউনে সঙ্ঘের একটি নতুন রাজ্য কার্যালয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে আরএসএস-এর সহ-সরকার্যবাহ (সর্বভারতীয় সহকারী সাধারণ সম্পাদক) রামদত্ত চক্রধর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মন্তব্য করেছেন। তিনি তাঁর ভাষণে স্পষ্ট ভাষায় মনে করিয়ে দেন যে, “ঢালু রাস্তাতেই দুর্ঘটনা বেশি ঘটে!” এর অর্থ হলো, প্রতিকূল পরিস্থিতির চেয়ে যখন চারপাশের পরিস্থিতি বা পরিবেশ অনুকূল থাকে, তখনই মানুষের পদস্খলন হওয়ার বা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার প্রবল মেগা আশঙ্কা থাকে। তাই রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এলেও সঙ্ঘের কর্মীদের আচরণ বা সঙ্কল্পে যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না ঘটে, সে বিষয়ে তিনি কড়া নির্দেশ দিয়েছেন।

আরএসএস-এর এই নতুন মেগা কার্যালয়টি গড়ে উঠেছে নিউ টাউনের অ্যাকশন এরিয়া ২ডি-তে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সঙ্ঘের রাজ্য সদর দপ্তর হিসেবে কাজ চালিয়ে আসছিল মানিকতলা এলাকার কেশব ভবন। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে রাজ্যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সামাজিক কাজ, শাখা এবং সংগঠনের আকার বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ব্যাপক সম্প্রসারণের ফলে পুরনো কেশব ভবনে স্থান সঙ্কুলান সংক্রান্ত বড়সড় সমস্যা দেখা দিচ্ছিল। সেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতেই ২০২৩ সালে নিউ টাউনের এই আধুনিক এবং সুপরিসর নতুন ভবন তৈরির কাজ শুরু হয়। বুধবার মূলত এই নতুন ভবনটিরই প্রাথমিক উদ্বোধন সম্পন্ন হলো। সঙ্ঘের প্রাক্তন এবং শ্রদ্ধেয় প্রচারক কেশবরাও দীক্ষিতের নামানুসারে এই নতুন বাড়িটির নামকরণ করা হয়েছে ‘কেশব স্মৃতি’। বুধবার সকালে পূর্ণ ধর্মীয় আচার ও বৈদিক রীতি মেনে এই ভবনের বাস্তুপুজো এবং হোমযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। এই পবিত্র অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন মূলত সঙ্ঘের একনিষ্ঠ স্বয়ংসেবকেরা এবং আরএসএস-এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ পদাধিকারীরা।
এই মেগা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সঙ্ঘের স্বয়ংসেবক এবং পদাধিকারীদের পাশাপাশি কিছুক্ষণের জন্য উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। জানা গিয়েছে, বুধবার যখন নতুন ভবনে বাস্তুপুজো এবং যজ্ঞ চলছিল, ঠিক সেই সময়েই মুখ্যমন্ত্রী নবনির্মিত ‘কেশব স্মৃতি’ ভবনে এসে পৌঁছান। তিনি অত্যন্ত ভক্তিভরে প্রণাম সেরে পুজোর কার্যক্রমে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য অংশগ্রহণ করেন। এরপর তিনি সেখানে উপস্থিত সঙ্ঘের বিভিন্ন স্তরের প্রবীণ প্রচারক ও শীর্ষ পদাধিকারীদের সঙ্গে কিছুক্ষণ একান্ত আলাপচারিতা সারেন। রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে তাঁর কাঁধে বহু দায়িত্ব থাকায়, সঙ্ঘের কার্যকর্তাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ সেরেই তিনি তাঁর পূর্বনির্ধারিত অন্য সরকারি ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে সেখান থেকে রওনা হয়ে যান। মুখ্যমন্ত্রীর এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থিতি সঙ্ঘের এই নতুন কার্যালয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের গাম্ভীর্যকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে তিনি চলে যাওয়ার পরেই রামদত্ত চক্রধরের ভাষণে মুখ্যমন্ত্রীর আগমনের এবং বর্তমান রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রসঙ্গ ফিরে আসে।

অনুষ্ঠানের একেবারে শেষ বক্তা হিসেবে মঞ্চে ওঠেন আরএসএস-এর শীর্ষ সর্বভারতীয় পদাধিকারী রামদত্ত চক্রধর। তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই তিনি স্মরণ করেন কেশবরাও দীক্ষিতের অসামান্য জীবন, ত্যাগ এবং কর্মকাণ্ডের কথা, যাঁর নামে এই নতুন মেগা ভবনটি উৎসর্গ করা হয়েছে। তিনি উপস্থিত স্বয়ংসেবকদের মনে করিয়ে দেন যে, শুরুর দিকে সঙ্ঘের কাজ বা প্রচারকদের জীবন কতটা কঠিন, কণ্টকাকীর্ণ এবং প্রতিকূল ছিল। সেই দুর্গম পথ পেরিয়ে আজ সঙ্ঘ যে অনুকূল এবং সম্মানজনক পরিস্থিতিতে এসে পৌঁছেছে, তার পেছনে রয়েছে হাজার হাজার স্বয়ংসেবকের নীরব আত্মত্যাগ। এই প্রসঙ্গ টেনেই তিনি তাঁর মূল সতর্কবাণীতে আসেন। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানান যে, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে মানেই স্বয়ংসেবকদের এটা ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই যে তাঁদের সমস্ত সমস্যার জাদুকরী সমাধান হয়ে গিয়েছে বা সঙ্ঘের পরম লক্ষ্যপূরণ হয়ে গিয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ কখনোই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হতে পারে না।
রামদত্ত চক্রধর তাঁর দীর্ঘ ভাষণের শেষে একটি অত্যন্ত গভীর এবং চিন্তাশীল বার্তা দিয়ে বলেন যে, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিজেপির চেয়ে আরএসএস-এর সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ব্যাপ্তি অনেক বেশি। বিগত কয়েক মাস ধরে বিজেপিকর্মীদের উদ্দেশে নেতৃত্বের তরফ থেকে একাধিক সতর্কবার্তা শোনা যাচ্ছিল, এবার আরএসএস-এর অন্দরেও সেই একই শৃঙ্খলার সুর ধ্বনিত হলো। তবে এই সতর্কবার্তা কোনো রাজনৈতিক দলের উদ্দেশে নয়, বরং এটি সঙ্ঘের নিজস্ব স্বয়ংসেবকদের চরিত্র এবং আদর্শ সংরক্ষণের একটি মেগা প্রয়াস। ক্ষমতার অলিন্দে অবস্থান করলে অহংকার, দুর্নীতি বা আদর্শগত বিচ্যুতির যে প্রলোভন তৈরি হয়, তার বিরুদ্ধেই মূলত এই ‘ঢালু রাস্তার’ তত্ত্ব খাড়া করেছেন রামদত্ত। সঙ্ঘের শীর্ষ নেতৃত্বের এই কড়া নির্দেশিকা বুঝিয়ে দিল যে, রাজনৈতিক সাফল্য যাই হোক না কেন, আরএসএস তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং ব্যক্তি নির্মাণের মূল চরিত্র থেকে এক চুলও সরতে রাজি নয়। স্বয়ংসেবকদের নিরলস সাধনা এবং সামাজিক কর্তব্যবোধই যে সঙ্ঘের আসল শক্তি, ‘কেশব স্মৃতি’-র উদ্বোধনী মঞ্চ থেকে সেই চিরন্তন বার্তাই ফের একবার অনুরণিত হলো।




