Uttarpara Biryani Controversy: ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাতের অভিযোগ স্থানীয়দের, কড়া হুঁশিয়ারি বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন চক্রবর্তীর
Hooghly: দুর্গাপুজোর উৎসবের আবহে গোটা রাজ্য যখন মাতোয়ারা, ঠিক সেই সময়েই একটি বিতর্কিত বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে তুমুল রাজনৈতিক ও সামাজিক তরজা শুরু হলো হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। সাধারণত উৎসবের মরশুমে বিভিন্ন খাবার দোকান বা রেস্তোরাঁ তাদের ব্যবসায়িক প্রসারের জন্য নানা ধরনের চমকপ্রদ বিজ্ঞাপনের আশ্রয় নিয়ে থাকে। কিন্তু এবার উত্তরপাড়ার হিন্দমোটর এলাকায় ১টি বিরিয়ানির দোকানের বিজ্ঞাপন সব সীমা অতিক্রম করে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগে চরম আঘাত হেনেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিজ্ঞাপনের পোস্টারে দেবী দুর্গার পবিত্র ছবির ঠিক পাশেই ১টি চিকেন বা মুরগির মাংসের বিরিয়ানির ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। আর এই অবমাননাকর ছবি ঘিরেই রবিবার সকাল থেকে এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদের পাশাপাশি এই ঘটনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক। তাঁর কড়া নির্দেশের পর শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে সেই বিতর্কিত বিজ্ঞাপনের পোস্টারগুলি খুলতে হয় ওই বিরিয়ানি বিক্রেতাকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এই অভাবনীয় এবং বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটেছে উত্তরপাড়ার হিন্দমোটর এলাকার শ্রীরাম গ্র্যান্ড সিটির ঠিক সামনে। পুজো উপলক্ষে ব্যবসা বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি স্থানীয় বিরিয়ানির দোকানের তরফ থেকে ওই এলাকায় বেশ কিছু বড় বড় পোস্টার সাঁটানো হয়েছিল। সেই পোস্টারগুলির নকশা এমনভাবে করা হয়েছিল যেখানে দেবী দুর্গার একটি সুন্দর ছবির ঠিক গা ঘেঁষেই রাখা হয়েছিল এক প্লেট চিকেন বিরিয়ানির প্রলুব্ধকর ছবি। শুধু তাই নয়, ক্রেতাদের আকর্ষণ করার জন্য সেই পোস্টারে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল, ‘এ পুজোয় ভক্তিতে মা’। দুর্গাপুজোর মতো একটি পবিত্র এবং সনাতন ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে আমিষ খাবারকে এভাবে জুড়ে দেওয়ায় রবিবার সকাল থেকেই তীব্র আপত্তি জানাতে শুরু করেন এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের স্পষ্ট দাবি, এই ধরনের কুরুচিকর বিজ্ঞাপন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ভাবাবেগকে মারাত্মকভাবে আঘাত করছে। খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছন উত্তরপাড়া থানার পুলিশ কর্মীরা।

এই চাঞ্চল্যকর খবরটি খুব দ্রুত পৌঁছে যায় স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন চক্রবর্তীর কানে। তিনি গোটা বিষয়টি জানতে পেরেই অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং অবিলম্বে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বিধায়ক দীপাঞ্জন চক্রবর্তী স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, কোনো অবস্থাতেই এই ধরনের ধৃষ্টতা বা অপমানজনক জিনিস বরদাস্ত করা যাবে কাম্য না। তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, “এটি নিছক কোনো আমিষ বা নিরামিষ বিতর্কের বিষয় নয়। একজন ব্যবসায়ীর কতখানি স্পর্ধা বা সাহস হলে সে পরম আরাধ্যা দেবী দুর্গার ছবির সঙ্গে একটি চিকেন বিরিয়ানির ছবি এক ফ্রেমে রাখতে পারে!” তাঁর মতে, ব্যবসার প্রসারের নামে এহেন সস্তা চমক হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ভাবাবেগকে চরমভাবে অপমানিত করেছে। বিধায়কের এই কড়া অবস্থানের পরেই পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয় এবং ওই বিরিয়ানি দোকানদারকে ডেকে অবিলম্বে রাস্তার সমস্ত পোস্টার খুলিয়ে দেওয়া হয়। বিধায়ক এও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে এ রকম কাজ হলে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উত্তরপাড়ার এই বিরিয়ানি বিতর্কের মাঝেই রাজ্যের অন্য প্রান্তেও খাবার এবং ধর্মকে কেন্দ্র করে প্রায় একই ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রবিবারই উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি শহরে রাজ্যের হেভিওয়েট মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষের বাড়ির সামনে ১টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বিতর্কিত পোস্টার সাঁটিয়েছে ১টি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। সেই পোস্টারে সাধারণ হিন্দু নাগরিকদের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে যে, দুর্গাপুজোর এই পবিত্র দিনগুলিতে তাঁরা যেন শুধুমাত্র হিন্দু মালিকানাধীন হোটেল বা রেস্তোরাঁ থেকেই বিরিয়ানি কিনে খান। শিলিগুড়ির বুকে এহেন বিভাজনমূলক পোস্টার পড়ায় সেখানেও নতুন করে রাজনৈতিক তরজা এবং বিতর্ক শুরু হয়ে গিয়েছে। একদিকে শিলিগুড়িতে নির্দিষ্ট ধর্মের হোটেল থেকে বিরিয়ানি খাওয়ার ডাক, আর অন্যদিকে হুগলির উত্তরপাড়ায় বিরিয়ানির বিজ্ঞাপনে দেবী দুর্গার ছবি ব্যবহার—এই ২ ঘটনা মিলিয়ে এবারের শারদোৎসবে খাবার এবং ধর্ম এক অত্যন্ত জটিল এবং সংবেদনশীল বিতর্কের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, উৎসবের আবহে এই ধরনের ঘটনা সমাজের সম্প্রীতি নষ্ট করতে পারে।

হুগলির হিন্দমোটর এলাকায় আপাতত ওই বিতর্কিত পোস্টারগুলি খুলে ফেলা হলেও এলাকার সাধারণ মানুষের মনে এখনও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। মা দুর্গার সঙ্গে আমিষ পদের এই দৃষ্টিকটূ সহাবস্থানকে অনেকেই বিপণনের নামে নোংরামি বলে আখ্যা দিচ্ছেন। সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই ঘটনার ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে নিন্দার ঝড় উঠেছে এবং নেটিজেনরা ওই বিরিয়ানির দোকান বয়কটেরও ডাক দিয়েছেন। তবে পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলেও এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও, এখনও পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের তরফ থেকে ওই দোকানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। তা সত্ত্বেও, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে কোনোভাবেই হাতের বাইরে বেরিয়ে না যায়, তার জন্য প্রশাসনের তরফ থেকে ওই এলাকায় কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। বিপণনের কৌশল এবং ধর্মীয় ভাবাবেগের এই সংঘাতে উৎসবের আনন্দ যাতে ম্লান না হয়, সেটাই এখন সকলের কাম্য।



