West Bengal Dengue Alert: আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজ্যে হলুদ সতর্কতা, জ্বর হলেই হাসপাতালে ভর্তির কড়া নির্দেশ
Kolkata: বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোর ঠিক প্রাক্কালে রাজ্যজুড়ে ক্রমশ চওড়া হচ্ছে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গির মারণ থাবা। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের কপালেও প্রবল চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে এই অজানা জ্বরের লাগামছাড়া দাপট। আবহাওয়া পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে, একদিকে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি এবং অন্যদিকে ভ্যাপসা গরম—সব মিলিয়ে মশা বংশবৃদ্ধির জন্য ১টি আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য ভবনের সাম্প্রতিক এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যে ইতিমধ্যেই ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজার পেরিয়ে গিয়েছে। সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, গত মাত্র ৫ দিনেই রাজ্যে নতুন করে প্রায় ১ হাজার মানুষ ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গিয়েছে। এই ক্রমবর্ধমান ডেঙ্গি পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আজই স্বাস্থ্য ভবনে ১টি অত্যন্ত জরুরি এবং উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠক ডাকা হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, আগাম সতর্কতা হিসেবে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সমগ্র রাজ্যজুড়ে ডেঙ্গির হলুদ সতর্কতা বা ইয়েলো অ্যালার্ট জারি রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।

রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের দেওয়া জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডেঙ্গি আক্রান্তের নিরিখে বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ এবং উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে রয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলা। এই মুহূর্তে শুধুমাত্র মুর্শিদাবাদেই ডেঙ্গি রোগীর সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৫০০ ছুঁইছুঁই। মুর্শিদাবাদের ঠিক পরেই আক্রান্তের নিরিখে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে খোদ রাজধানী কলকাতা। তিলোত্তমায় ইতিমধ্যেই প্রায় ১ হাজার জন ডেঙ্গির কবলে পড়েছেন, যা শহরের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ওপর ১টি বড়সড় চাপের সৃষ্টি করেছে। তৃতীয় স্থানে রয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা, যেখানে প্রায় ৭৫০ জন ডেঙ্গি রোগীর সন্ধান মিলেছে। এর পাশাপাশি, উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদিয়া জেলাতেও ডেঙ্গির প্রকোপ ক্রমশ বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে, এই ২ জেলায় ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ইতিমধ্যেই প্রায় ৭০০ ছুঁয়েছে। উৎসবের মরশুমে মানুষের মেলামেশা বাড়লে এবং মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড় জমলে এই সংক্রমণের সংখ্যা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে বলে প্রবল আশঙ্কা প্রকাশ করছেন রাজ্যের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

এই ক্রমবর্ধমান এবং ভয়াবহ ডেঙ্গি পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য রাজ্য স্বাস্থ্য ভবন বা স্বাস্থ্য় দপ্তরের তরফ থেকে ১টি অত্যন্ত কড়া এবং জরুরি নির্দেশিকা বা অ্যাডভাইজারি জারি করা হয়েছে। এই নির্দেশিকায় রাজ্যের আপামর জনসাধারণকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য ভবনের স্পষ্ট এবং কড়া নির্দেশ হলো, কোনোভাবেই নিজের চিকিৎসা নিজে করা যাবে বায়ু বা পাড়ার ওষুধের দোকান থেকে ইচ্ছেমতো অ্যান্টিবায়োটিক বা ব্যথানাশক ওষুধ কিনে খাওয়া যাবে না, কারণ এতে রোগীর রক্তের প্লেটলেট আচমকা কমে গিয়ে প্রাণসংশয় হতে পারে। জ্বরের প্রথম দিন থেকেই রোগীকে অত্যন্ত সাবধানে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে এবং ডেঙ্গির প্রাথমিক উপসর্গের দিকে কড়া নজর রাখতে হবে। সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে কোনোভাবেই গাঁটে গাঁটে ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা বা শরীরে র্যাশ বেরোনোর মতো ডেঙ্গির লক্ষণগুলিকে অবহেলা করা চলবে না। জ্বর আসার সঙ্গে সঙ্গেই দেরি না করে অবিলম্বে ১ জন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য এবং প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করানোর জন্য নির্দেশিকায় বারবার জোর দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ Humayun Kabir Arrest: ‘পুলিশ ভোট করিয়েছে’, ১২ ঘণ্টা পর থানা থেকে বেরিয়েই বিস্ফোরক হুমায়ুন
স্বাস্থ্য ভবনের জারি করা এই বিশেষ অ্যাডভাইজারিতে কোমর্বিডিটি বা অন্যান্য জটিল শারীরিক সমস্যা থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত এবং চরম সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো রোগীর জ্বরের সঙ্গে ডেঙ্গির উপসর্গ থাকে এবং তার পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের সমস্যা, কিডনির রোগ বা হাঁপানির মতো অন্য কোনো পুরনো ক্রনিক শারীরিক সমস্যা থাকে, তবে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করা যাবে না। এই ধরনের স্পর্শকাতর রোগীদের বাড়িতে ফেলে না রেখে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিকটবর্তী কোনো সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ, কোমর্বিডিটি থাকা ডেঙ্গি রোগীদের ক্ষেত্রে শারীরিক অবস্থার যেকোনো সময় চরম অবনতি ঘটতে পারে, যার ফলে রোগীর শরীরে তরলের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ডেঙ্গি শক সিনড্রোম দেখা দিতে পারে। হাসপাতালে ভর্তি থাকলে চিকিৎসকদের কড়া পর্যবেক্ষণে রোগীর রক্তের প্লেটলেট এবং হেমাটোক্রিট লেভেল নিয়মিত মাপা সম্ভব হয়, যা জীবন বাঁচাতে অত্যন্ত জরুরি।
![]()
দুর্গাপুজোর আগে যাতে এই মশাবাহিত রোগের প্রকোপ কোনোভাবেই মহামারির আকার ধারণ করতে না পারে, তার জন্য স্বাস্থ্য দপ্তরের পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন পুরসভা এবং পঞ্চায়েতগুলিকেও অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে বলা হয়েছে। রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ডেঙ্গি প্রতিরোধ করতে পুজো শুরুর আগেই রাজ্যে আরও বেশ কিছু কড়া উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। মশার লার্ভা ধ্বংস করার জন্য পাড়ায় পাড়ায় নিয়মিত স্প্রে করা, জমা জল পরিষ্কার করা এবং ড্রোন ব্যবহার করে বহুতলের ছাদে জমে থাকা জল চিহ্নিত করার কাজ জোরকদমে চলবে। এছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে ডেঙ্গি সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য লাগাতার মাইকিং এবং প্রচার চালানো হবে। সাধারণ নাগরিকদেরও নিজেদের বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা, ফুলের টব বা বাতিল টায়ারে যাতে দীর্ঘদিন জল জমে না থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়ার জন্য প্রশাসনের তরফ থেকে আন্তরিকভাবে আবেদন জানানো হয়েছে। সম্মিলিত সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করাই ডেঙ্গির বিরুদ্ধে এই কঠিন লড়াইয়ে জয়লাভ করার একমাত্র নিশ্চিত চাবিকাঠি।




