Gyanesh Kumar House Purification: দলিতরা দেওয়াল স্পর্শ করাতেই কি পৈতৃক বাড়িতে শুদ্ধিকরণ? আগ্রার ঘটনায় প্রবল বিতর্ক
Agra: দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যখন ভোট চুরির অভিযোগ তুলে তীব্র রাজনৈতিক ডামাডোল চলছে, ঠিক তখনই উত্তরপ্রদেশের আগ্রা থেকে ১টি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর খবর সামনে এল। আগ্রার বিজয়নগর এলাকায় অবস্থিত জ্ঞানেশ কুমারের পৈতৃক বাড়ির বাইরে কিছুদিন আগে কংগ্রেসের তরফ থেকে ১টি বিশাল বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়েছিল। আর সেই বিক্ষোভের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার তাঁর সেই পৈতৃক বাড়িতে রীতিমতো গঙ্গাজল ছিটিয়ে এবং সমবেত কণ্ঠে রামায়ণ পাঠ করে বিশেষ ‘শুদ্ধিকরণ’ অভিযান চালানো হলো। এই শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার একাধিক ভিডিও এবং ছবি ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়ে গিয়েছে, যা নিয়ে রাজ্য এবং জাতীয় রাজনীতিতে প্রবল আলোড়ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং তাঁর পরিবারের মানসিকতা নিয়ে একাধিক অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং জোরালো প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। দেশের ১ জন শীর্ষ সাংবিধানিক কর্তার বাড়িতে এহেন ঘটনা আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন কোনো মেরুকরণের সৃষ্টি করবে কি না, সেই বিষয়টি নিয়েও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রবল চর্চা শুরু হয়ে গিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল গত ২৮শে সেপ্টেম্বর। ওই দিন আগ্রার বিজয়নগর এলাকায় অবস্থিত জ্ঞানেশ কুমারের পৈতৃক বাড়ির সামনে স্থানীয় কংগ্রেস কর্মী এবং সমর্থকরা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ১টি বড়সড় বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় দেশজুড়ে ব্যাপক অনিয়ম এবং ভোট চুরির গুরুতর অভিযোগ তুলেই গোটা দেশ যখন উত্তাল, তখন জ্ঞানেশের পৈতৃক বাড়ির বাইরেও সেই বিক্ষোভের আঁচ আছড়ে পড়েছিল। বিক্ষোভ চলাকালীন কংগ্রেস কর্মীরা বাড়ির মূল ফটকে অত্যন্ত কালিতে ‘জ্ঞানেশ গদ্দার’ এবং ‘চোর’ লেখা একাধিক স্লোগান লিখে দেন বলে অভিযোগ ওঠে। নির্বাচন কমিশনের মতো ১টি স্বাধীন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ আধিকারিকের বাড়ির সামনে এই ধরনের নজিরবিহীন বিক্ষোভ এবং স্লোগান লেখার ঘটনা প্রশাসনকেও বেশ বড়সড় চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান রক্ষকের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এমন পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং প্রকাশ্য রাস্তায় স্লোগান লেখার দৃশ্য সত্যিই অভাবনীয় ছিল। এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছিল এবং বাড়ির নিরাপত্তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর তার ঠিক পরেই হঠাৎ করে এই শুদ্ধিকরণের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
এই প্রবল বিক্ষোভ এবং স্লোগান লেখার ঘটনার ঠিক পরপরই জ্ঞানেশ কুমারের পরিবারের তরফ থেকে ওই পৈতৃক বাড়িতে ১টি মহা ‘শুদ্ধিকরণ’ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাড়ির সদস্যদের উদ্যোগে প্রথমে স্থানীয় এলাকা জুড়ে ১টি সুসজ্জিত ‘কলস যাত্রা’ বের করা হয়। এরপর বাড়ির ভেতরে ১টি বিশেষ প্রার্থনা সভার বিশাল আয়োজন করা হয়, যেখানে সমবেত কণ্ঠে হিন্দু পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘রামায়ণ’-এর ‘সুন্দরকাণ্ড’ অত্যন্ত ভক্তিভরে পাঠ করা হয়। জ্ঞানেশ কুমারের বৃদ্ধা মা সত্যবতী গুপ্ত সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রকাশ্যে দাবি করেন যে, বিক্ষোভকারীরা তাঁদের বাড়িটিকে সম্পূর্ণ ‘নোংরা’ করে দিয়ে গিয়েছিল এবং বাড়ির মূল ফটকে অত্যন্ত ‘আপত্তিকর’ ও অপমানজনক শব্দ লেখা হয়েছিল। সত্যবতী দেবী আরও জানান যে, এই অপরিচ্ছন্নতা এবং অপবিত্রতা দূর করার উদ্দেশ্যেই তাঁরা মন্দির থেকে পবিত্র গঙ্গাজল এনেছেন এবং ‘সুন্দরকাণ্ড’ পাঠ সম্পূর্ণ হওয়ার পর সেই গঙ্গাজল সারা বাড়িতে ছিটিয়ে সম্পূর্ণ বাড়িটিকে নতুন করে শুদ্ধ করেছেন। পরিবারের দাবি, বাড়ির পবিত্রতা এবং ইতিবাচক শক্তি ফিরিয়ে আনতেই এই ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, এর মধ্যে অন্য কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই।
জ্ঞানেশ কুমারের পরিবারের এই শুদ্ধিকরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলির মধ্যে নতুন করে চরম রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। আগ্রা শহরের জেলা কংগ্রেস সভাপতি অমিত সিং এই শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়াকে তীব্র কটাক্ষ করে বলেছেন যে, এর চেয়ে জ্ঞানেশ কুমারের পরিবারের উচিত ছিল তাঁর সুবুদ্ধি উদয়ের জন্য ১টি বড় যজ্ঞের আয়োজন করা, আর সেই যজ্ঞে কংগ্রেস দলও খুশি মনে যোগ দিত। তবে কংগ্রেসের তরফ থেকে এই ঘটনার নেপথ্যে ১টি অত্যন্ত মারাত্মক এবং গভীর সামাজিক অভিযোগ তোলা হয়েছে। কংগ্রেসের দাবি, এই তথাকথিত ‘শুদ্ধিকরণ’-এর আড়ালে আসলে ১টি অত্যন্ত ঘৃণ্য অস্পৃশ্যতার মানসিকতা লুকিয়ে রয়েছে। তাদের স্পষ্ট যুক্তি হলো, গত ২৮শে সেপ্টেম্বরের ওই প্রতিবাদ বিক্ষোভে প্রচুর সংখ্যক দলিত এবং সমাজের অনগ্রসর শ্রেণির মানুষ সক্রিয়ভাবে শামিল ছিলেন এবং তাঁরা বিক্ষোভ দেখানোর সময় জ্ঞানেশ কুমারের বাড়ির দেওয়াল স্পর্শ করেছিলেন। দলিতদের সেই স্পর্শের কারণেই বাড়িটি অপবিত্র হয়ে গিয়েছে ভেবেই এই শুদ্ধিকরণের নাটক করা হলো কি না, সেই গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে তারা। ভারতের মতো ১টি গণতান্ত্রিক দেশে আজও যদি কোনো উচ্চপদস্থ সরকারি আমলার পরিবারে এমন জাতপাতের বৈষম্য এবং অস্পৃশ্যতার চিন্তাধারা লুকিয়ে থাকে, তবে তা সমগ্র দেশের জন্য চরম লজ্জার বিষয় বলে বিরোধীরা দাবি করেছেন।
এই সম্পূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ আগ্রার রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিবেশকে অনেকটাই উত্তপ্ত করে তুলেছে। জানা গিয়েছে যে, জ্ঞানেশ কুমারের পৈতৃক বাড়ির বাইরে গত মাসের সেই তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং বাড়ির দেওয়ালে আপত্তিকর শব্দ লেখার ঘটনার পর স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। পুলিশের তরফ থেকে মোট ৬ জন সক্রিয় কংগ্রেস কর্মীকে ঘটনাস্থল থেকে তৎক্ষণাৎ গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় ১টি বড় মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর দেওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বেশ কয়েকদিন পুলিশ এবং বিচারবিভাগীয় হেফাজতে থাকার পর পরবর্তীতে ওই ৬ জন কংগ্রেস কর্মী আদালত থেকে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে জামিন পেতে সক্ষম হন। তবে জামিন পেলেও এই শুদ্ধিকরণ এবং অস্পৃশ্যতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের প্রধানের সঙ্গে কংগ্রেসের এই রাজনৈতিক এবং আদর্শগত লড়াই যে আগামী দিনে আরও চরম আকার ধারণ করতে চলেছে, তা একপ্রকার নিশ্চিত করেই বলা যায়। একদিকে যখন দেশের শীর্ষ আদালত নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কড়া প্রশ্ন তুলছে, ঠিক তখনই আগ্রার এই শুদ্ধিকরণ এবং অস্পৃশ্যতার বিতর্ক জ্ঞানেশ কুমারের ব্যক্তিগত এবং পেশাগত ভাবমূর্তিকে আরও বেশি কালিমালিপ্ত করে তুলল বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। আগামী দিনে এই বিতর্ক আরও কতদূর গড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।



